এলপিজি সংকটে দিশেহারা ভোক্তা, বাজারে বাড়তি দামের কবলে সাধারণ মানুষ

সারা দেশে রান্নার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই সুযোগকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে। বর্তমানে ১২ কেজি ওজনের বহুল ব্যবহৃত প্রতিটি সিলিন্ডারের দাম সরকারিভাবে ২৫২ টাকা বাড়ানোর পরও খুচরা বাজারে তা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও পুরনো সিলিন্ডার ফেরত না নিয়ে ক্রেতাদের বাধ্য করা হচ্ছে নতুন সিলিন্ডার কিনতে। সব মিলিয়ে অক্টোবরে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারিত থাকলেও বাজারে তা ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার বাইরে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। তবে বাজারে প্রতিটি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২৫০০ টাকায়। এতে দেখা যায়, ওমেরা এলপিজি গ্যাস ২,০৫০ টাকা, বসুন্ধরা এলপিজি গ্যাস ২,৩০০ টাকা, ফ্রেশ এলপিজি গ্যাস ২,১০০ টাকা, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি গ্যাস ১,৯০০ টাকা, ইউনি এলপিজি গ্যাস ২,২০০ টাকা, ডেল্টা এলপিজি ২,২০০ টাকা, তীর এলপিজি ২,২০। এর মধ্যেই আরেক দফা দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত কার্যক্রমের বিবরণীতে বলা হয়- (১) ঢাকা জেলার বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পারিচালনা করা হচ্ছে। (২) কৃত্রিম সংকট তৈরি বা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে এলপিজি গ্যাস বিক্রির অপরাধে সংশ্লিষ্ট। 1, 2, 3. সতর্ক করা হচ্ছে। (৪) অক্টোবর/২০২৬ মাসে এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য নিয়ন্ত্রণে মোট ১০টি অভিযান পরিচালনা করার কথা উল্লেখ রয়েছে এতে। এতে ১২ কেজি করে ৮৩ লাখ সিলিন্ডার পায় গ্রাহক। যার জন্য দরকার ৩ কোটি ৩২ লাখ সিলিন্ডার, যা এখন নিয়মিত পাওয়া যায় না। এলপিজি খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ সৌদিতে ছড়িয়ে পড়ার পর গত মাসে বিশ্ববাজারে এলপিজি’র দাম বেড়ে যায়। ২০২১ সালে বিতরণ কোম্পানি ও খুচরা পর্যায়ে কমিশন নির্ধারণ হয়েছে।
আরও পড়ুন: সার্বিয়ার নির্বাচনে হেরে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার অবসান মেনে নিলেন ভুসিচ
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ক্রেতা নুরী মিয়া জানান, নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, তাকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় একটি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। আজিমপুরের বাসিন্দা ইয়ারুল কবিরের অভিজ্ঞতাও একই, তিনি ২ হাজার ৩০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনেছেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, আমদানিকারকদের ২৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র কয়েকটি সক্রিয়ভাবে আমদানি করছে। আগস্টে ১৩টি এবং সেপ্টেম্বরে ১০টি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করেছে, যার ফলে বাজারে সরবরাহ সংকটে পড়েছে। কেউ কেউ অন্যদের থেকে কিনে বাজারে কিছুটা সরবরাহ করছে, আর কারও সরবরাহ নামমাত্র। তিনি বলেন, আমদানিকারকদের বড় একটা গ্রুপ এলপিজি আনতে পারছে না।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানো ঢাকা জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির এলপিজি ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ঢাকা জেলায় চলছে কঠোর তদারকি। কার্যক্রমের অংশ হিসেবে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২৩শে অক্টোবর ঢাকা জেলা প্রশাসন কর্তৃক এলপিজি’র বাজারমূল্য তদারকি কার্যক্রমের একটি তথ্য প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব বরাবর প্রেরণ করেছে।
আরও পড়ুন: জাপানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মঙ্গলবার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
- ঢাকা জেলার বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
- কৃত্রিম সংকট তৈরি বা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে এলপিজি বিক্রির অপরাধে বিক্রেতাদের সতর্ক করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
- দোকানদারদের মূল্য তালিকা প্রদর্শন ও নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রির বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
- অক্টোবর ২০২৬ মাসে মূল্য নিয়ন্ত্রণে মোট ১০টি অভিযান পরিচালনা করার কথা জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সংকট বেড়েছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দাবি করেছেন, অসাধু আমদানিকারকরা পরিকল্পিতভাবে মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। এতে মাত্র এক মাসে তারা ৬০০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ভোক্তা জিম্মি হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। তবে যুদ্ধটা বন্ধ হলে আশা করি তা থাকবে না। তারা বলছে, প্রতি মাসে সমন্বয়ের সময় সৌদি কার্গো মূল্য, প্রিমিয়াম (জাহাজভাড়া, বীমা), ডলারের দর ও জ্বালানি তেলের দাম ধরে নতুন দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। লুণ্ঠনের বাজারে ভোক্তারা জিম্মি, আর বিইআরসি নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, এলসি জটিলতা এবং আমেরিকা থেকে গ্যাস আমদানিতে দীর্ঘ সময় ও বাড়তি জাহাজ ভাড়ার কারণে আমদানিকারকরা সংকটে পড়েছেন। সম্প্রতি সাংবাদিকদের এক অনুষ্ঠানে বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ দেশে এলপিজি সংকট এবং আসন্ন শীত মৌসুম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আমদানিকারকরা গত পাঁচ বছরের বর্ধিত খরচের দোহাই দিয়ে নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। এই প্রস্তাবের ওপর আগামী ২৯শে অক্টোবর বিইআরসি গণশুনানি করবে। ফলে সহসা দাম কমার সম্ভাবনা নেই। শীতকালে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের জ্বালানি সরবরাহকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। বর্তমানে দেশে মাসে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ করা হচ্ছে, তবে চাহিদা মেটাতে এ পরিমাণ পর্যাপ্ত নয়। এক সময় মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টন আমদানি হলেও এখন তা ১ লাখ ৬০ হাজার টনের নিচে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেকেই এখন বিদ্যুৎচালিত চুলার মতো বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন। এর মধ্যে অন্যান্য খরচও বাড়ানোর দাবি তুলেছেন পরিবেশক ও আমদানিকারকরা। অথচ আরও অন্তত ৬০ লাখ সিলিন্ডার সক্রিয় থাকলে মাসে গ্রাহকের কাছে ১৫ লাখ সিলিন্ডারের সরবরাহ বাড়তো। দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে আমদানিকারক কোম্পানিগুলো, যারা অপারেটর হিসেবে পরিচিত।
















