ইরানে যুদ্ধ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাড়ছে জানফাদা স্বেচ্ছাসেবক কর্মসূচি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান সরকার তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাচ্ছে। ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস, নেতানিয়াহুকেও সরিয়েছিলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘আয়োজকদের বেশির ভাগই বয়স্ক পুরুষ।
যেকোনো সময় বড় ধরনের হামলা হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই দেশজুড়ে সাধারণ মানুষকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও সামরিক মহড়ায় যুক্ত করা হচ্ছে। তবে সব বয়সী মানুষই এতে যোগ দিতে পারেন। হুতিদের ভান্ডারে কতটা ভয়ংকর অস্ত্র আছে, কোথা থেকে আসছে, সৌদি আরব কেন হামলা ঠেকাতে পারছে না।
যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন তিনি শিগগিরই কোনো হামলা চালাচ্ছেন না, তবুও ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর আগের দিন বলেছিলেন, রোববারের (গতকাল) মধ্যে হামলা চালাবেন নয়তো ইরানের সঙ্গে চুক্তি হবে।
আরও পড়ুন: ইউএনওর বিরুদ্ধে পোস্ট দেওয়া জামালগঞ্জের এসিল্যান্ডকে সিলেটে বদলি
সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত এই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘জানফাদা’, যার আক্ষরিক অর্থ ‘যাঁরা জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত’ বা ‘জীবনপণ যোদ্ধা’। এ কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণ পাওয়া ব্যক্তিরা দেশের নিরাপত্তার জন্য কাজ করবেন জীবন বাজি রেখে। এই কর্মসূচির আওতায় তেহরান, ইসফাহান, জানজান, শিরাজ, কেরমান, মাশহাদ, বোজনুর্দ, আহভাজসহ বিভিন্ন শহরে সরকারি উদ্যোগে অনুষ্ঠান ও সশস্ত্র ‘মহড়া’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কখনো কখনো দিনের বেলায় সমাবেশ ও গাড়িবহর নিয়ে শোভাযাত্রাও অনুষ্ঠিত হয়। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বাসিন্দা বলেন, ‘মাঝেমধ্যে তারা ছোটখাটো পুরস্কার দেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষের দিকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি এখন ইরানের বড় শহরগুলো ছাড়িয়ে ছোট শহর ও গ্রামীণ জনপদেও বিস্তৃত হয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সহযোগী বাসিজ মিলিশিয়া এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক হুমকি মোকাবিলায় সাধারণ নারী-পুরুষকে প্রস্তুত করা, যেখানে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি হুমকি মোকাবিলায় তাঁদের কাজে লাগানো হবে। তরুণদের অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি প্রাদেশিক রাজধানী সানানদাজে আয়োজিত এক শোভাযাত্রাকে শিয়া ও সুন্নি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘ঐক্যের’ মহড়া হিসেবে বর্ণনা করেছে। আর ১২ বছরের বেশি বয়সী নারী-পুরুষের মোট সংখ্যার অর্ধেকের বেশি।
ইরানের ৩১টি প্রদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চত্বর ও প্রকাশ্যে চলা এসব প্রশিক্ষণ ও মহড়ায় সাধারণ মানুষকে পিস্তল, রাইফেল চালানোসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের কৌশল শেখানো হয়। বাসিজের প্রশিক্ষণ উপপ্রধান আলী কাউসারি জানান, তেহরানের অন্তত ১৪টি প্রধান চত্বরসহ প্রতিটি প্রদেশের রাজধানীতে এক থেকে তিনটি স্থানে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে কতটি শহরে কার্যক্রম চলছে, তা সরকারিভাবে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় প্রতি রাতেই তাঁরা প্রধান চত্বরে জড়ো হচ্ছেন। কীভাবে ম্যাগাজিনে গুলি ভরতে হয়, কীভাবে পিস্তল ও রাইফেল ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করতে হয় এবং কীভাবে নিশানা করে গুলি চালাতে হয়, তা শেখায়। ইরানে একা ইসরায়েল আসলে কী করতে পারবে, তেহরানের সক্ষমতা কোথায়। তাঁরা নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে চাইছেন।’।
আরও পড়ুন: চার দিনের সরকারি সফরে জাপান পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
গিলান প্রদেশের এক বাসিন্দা আল-জাজিরাকে জানান, সড়কে নিয়মিত সরকারি কেন্দ্র দেখা যায় যেখানে বিপ্লবী গান বাজানো হয় এবং উচ্চশব্দে লাউডস্পিকারে স্লোগান দেওয়া হয়। ১৫ অক্টোবর রাশত শহরে একটি সরকারপন্থী মহড়ার সময় সড়ক বন্ধ রাখা ও বিকট শব্দের প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। আবার কারাজ শহরে মহড়া থেকে আসা বিকট বিস্ফোরণের শব্দে স্থানীয়দের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়।
নিবন্ধিত এসব স্বেচ্ছাসেবককে শুধু যুদ্ধের জন্য নয়, বরং উদ্ধারকাজ, সামাজিক সেবা এবং গণমাধ্যমসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া চলমান যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য ‘শিক্ষার্থী জানফাদা’ কর্মসূচি চালু করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আলিরেজা কাজেমি, যা শিশুদের সামরিক ও আদর্শিক প্রশিক্ষণে সম্পৃক্ত করছে। তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করেনি।
কর্মসূচির বিশালতা নিয়ে সরকারি দাবির সঙ্গে বাস্তবতার গরমিল রয়েছে। ইরান সরকার দাবি করেছে, তাদের ওয়েবসাইটে ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। তবে বেশ কয়েকজন অধিকারকর্মী ওয়েবসাইটের সোর্স কোড বিশ্লেষণ করে দাবি করেছেন, প্রকৃত নিবন্ধিত সংখ্যা ৪০ লাখের কম। এছাড়া নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র নয়, বরং কেবল একটি ফোন নম্বরই যথেষ্ট ছিল, যা তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। প্রদেশটির সঙ্গে ইরাকের সীমান্ত রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই গণসংগঠিতকরণ প্রক্রিয়াকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। গত জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে হওয়া বিক্ষোভে হাজারো বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর, সরকার এই উদ্যোগকে ‘বিপ্লব রক্ষার’ প্রয়োজনীয় কৌশল হিসেবে প্রচার করছে। লোরেস্তান প্রদেশের আইআরজিসি কমান্ডার নেমাতোল্লাহ বাঘেরি জানিয়েছেন, এর মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের সঙ্গে ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক সংহতি প্রমাণ করা। তিনি বলেন, ‘এর উদ্দেশ্য হলো দেখানো যে সরকার যেমন জনগণকে সমর্থন করে, তেমনি জনগণও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও ইসলামি বিপ্লবকে সমর্থন করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার মূলত তার বিদ্যমান সমর্থকদের মধ্যে আনুগত্য আরও সুসংহত করার চেষ্টা করছে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহরান কামরাভা মনে করেন, এর মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার সম্ভাবনা কম। তিনি একে ‘সাইকেল চালানোর মতো’ এক মরিয়া প্রয়াস হিসেবে দেখছেন, যেখানে পতন এড়াতে সরকারকে ক্রমাগত প্রচার ও কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে হচ্ছে। খারাপভাবে পড়ে যাওয়া এড়াতে হলে জোরে প্যাডেল চালিয়ে যেতে হয়।
ইরান সরকার অবশ্য এই পুরো আয়োজনকে যুদ্ধ ও আগ্রাসন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি হিসেবে দেখছে। যদিও জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দেশটিতে ক্রমবর্ধমান মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও বিদ্রোহ দমনের বিষয়গুলো নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তেহরান অবশ্য শুরু থেকেই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং তাদের কার্যক্রমকে দেশটির সার্বভৌমত্ব রক্ষার অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। বর্তমানে চলমান ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই জানফাদা কর্মসূচির সম্প্রসারণ ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। তবে দেশের বাইরে থাকা ইরানি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কয়েকটি এসব সশস্ত্র কর্মসূচিকে মানুষকে ‘ভয় দেখানোর’ অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের স্বাধীন তথ্য অনুসন্ধান মিশনের অনুসন্ধানও প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান সরকার।
















