জেএমসির সম্প্রসারণে এক রাতেই মিলল ১০ লাখ ডলার অনুদান

নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের (জেএমসি) ভবন সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য আয়োজিত এক বিশেষ ফান্ডরেইজিং ডিনারে অভূতপূর্ব সাড়া মিলেছে। গত ২৪ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যায় ইস্ট এলমহার্স্টের লাগোয়ার্ডিয়া এয়ারপোর্ট ম্যারিয়ট হোটেলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলারের অনুদান ও প্রতিশ্রুতি সংগৃহীত হয়েছে। কুইন্সের অন্যতম প্রাচীন এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণকাজ সম্পন্ন করতে কমিউনিটির এই সম্মিলিত দানশীলতা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের মুসলিম কমিউনিটির সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি আধুনিক, সমৃদ্ধ ও যুগোপযোগী ইসলামিক সেন্টার গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজকেরা। এতে নিউইয়র্কের বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে অংশ নেন বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি, মুসলিম কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসায়ী, সমাজসেবী ও শুভানুধ্যায়ীরা। অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের চলমান সম্প্রসারণ প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় কমিউনিটির অংশগ্রহণ আরও জোরদার করা। আয়োজকেরা বিশেষভাবে নতুন প্রজন্মকে ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য নিরাপদ, শিক্ষামূলক ও ধর্মীয় পরিবেশ গড়ে তুলতে জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের সম্প্রসারণকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়। অতীতের মতো এবারও প্রবাসীদের আন্তরিক অংশগ্রহণে চলমান প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দীর্ঘদিন ধরে মুসল্লিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষত জুমার নামাজ, রমজান ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে স্থানসংকুলানের সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে জেএমসি কর্তৃপক্ষকে। সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এ সংকট অনেকাংশে দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নতুন তলা সংযোজনের পাশাপাশি বিদ্যমান ভবনের বিভিন্ন অংশের সমন্বয়, অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং চলাচলের সুবিধা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে লিফটের মাধ্যমে বিভিন্ন তলায় যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে, যাতে প্রবীণ মুসল্লি এবং চলাচলে অসুবিধার সম্মুখীন ব্যক্তিরা সহজে ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন। প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে কাজ শুরু হলেও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং নির্মাণব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ কারণে অবশিষ্ট কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে বিশেষ তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় জেএমসির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ও নির্বাহী কমিটি। গত ১২ অক্টোবর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জেএমসি কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের অগ্রগতি ও অর্থসংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জানায়, নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে আরও প্রায় ২০ লাখ ডলারের প্রয়োজন রয়েছে। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি ও বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় মুসলিম কমিউনিটির ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের নাম। প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমার জামাতের পাশাপাশি কোরআন শিক্ষা, হিফজ কার্যক্রম, ধর্মীয় আলোচনা এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষের জন্য শিক্ষামূলক আয়োজন পরিচালিত হয়। প্রবাসজীবনে নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখা এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অনেক পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁদের প্রত্যাশা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন সম্প্রসারিত ভবনটি আগামী প্রজন্মের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক বন্ধন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার একটি স্থায়ী কেন্দ্র হয়ে উঠবে। প্রায় পাঁচ দশক আগে প্রবাসী মুসলমানদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ নতুন প্রজন্মের চাহিদা পূরণে সেই প্রতিষ্ঠান আরও বড় পরিসরে এগিয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: সৌদির বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটিতে হুতিদের নিরাপত্তা ঘটনায়
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ শেখ উসমান বিন ফারুক। এছাড়া অতিথি বক্তা হিসেবে ইসলামি গবেষক শেখ ড. জাকির আহমেদ, জেএমসির পরিচালক ইমাম শামসি আলী এবং প্রধান ইমাম মাওলানা আবু জাফর বেগ গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। জেএমসির সাধারণ সম্পাদক ও কমিউনিটি নেতা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম দেলোয়ারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করা হয়। এসময় প্রতিষ্ঠানের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ডা. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান তুহিন, সভাপতি ডা. নাজমুল এইচ খান এবং সহসভাপতি ও ফান্ডরেইজিং কমিটির চেয়ারম্যান আফতাব মান বক্তব্য দেন। বক্তারা ইসলামি বিশ্বাসে মসজিদ নির্মাণ ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে আর্থিক সহযোগিতাকে সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন। জেএমসির কর্মকর্তারা কমিউনিটির সকল দাতার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানান, প্রবাসীদের সম্মিলিত উদ্যোগই এই প্রতিষ্ঠানের পথচলার প্রধান শক্তি। বক্তারা মসজিদ নির্মাণ, ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে দানের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: ডেন্টাল হাইজিনিস্ট থেকে ফ্লোরিডার উদ্যোক্তা সন্দ্বীপের জাহান রিমা
জেএমসির বর্তমান ভবন সম্প্রসারণ প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এই পরিকল্পনার আওতায় বিদ্যমান দ্বিতল ভবনটিকে চারতলায় উন্নীত করা হচ্ছে। নতুন তৃতীয় ও চতুর্থ তলা নির্মাণের ফলে ভবনে অতিরিক্ত ৫ হাজার ৬৫০ বর্গফুট জায়গা যুক্ত হবে, যা প্রতিষ্ঠানের মোট আয়তনকে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার বর্গফুটে উন্নীত করবে। এই সম্প্রসারণের মাধ্যমে দ্বিতীয় তলায় অতিরিক্ত প্রায় ১৮০ জন মুসল্লির একসঙ্গে নামাজ আদায়ের সুযোগ তৈরি হবে। সম্পূর্ণ এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০ লাখ মার্কিন ডলার।
উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালে যাত্রা শুরু করা জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার বর্তমানে কুইন্সের ৮৫-৩৭, জেএমসি ওয়ে (১৬৮ স্ট্রিট) ঠিকানায় অবস্থিত। ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে আল-মামুর মসজিদ ভবনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ধর্মীয় ও সামাজিক সেবায় নতুন মাত্রা যোগ করে। এরপর ২০০১ সালে হিফজ শিক্ষার কার্যক্রম শুরু হয়, যা পরে জামিয়া কোরআনিয়া একাডেমি হিসেবে পরিচিতি পায়। পাশাপাশি ২০০৩ সালে আল-মামুর স্কুল ও ইকরা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির সেবামূলক পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। আগামী বছরগুলোতে অর্ধশতাব্দীর ঐতিহ্যের ধারক এই প্রতিষ্ঠানটি কমিউনিটির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। এক রাতের আয়োজনে সংগৃহীত এই বিপুল অর্থ প্রমাণ করল যে, অভিন্ন লক্ষ্য থাকলে প্রবাসী কমিউনিটি কতটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।
















