স্থানীয় সরকারের ৬৬ খাতে ২৮ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম

স্থানীয় সরকার খাতের উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ, সরকারি নিয়োগ, ভ্যাট-কর আদায় ও বাজার ব্যবস্থাপনার মতো ৬৬টি খাতে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে সরকারি তদন্তে। গত ১৭ বছরে এসব খাতে ২৭ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকার অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এই প্রতিবেদনটি এখন অধিকতর নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে। গত ১৯ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে অধিকতর নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য প্রতিবেদনটি দুদকে পাঠানো হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছরসহ ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়েছে।
এতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও ঢাকা ওয়াসার কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অনিয়মের তালিকায় রয়েছে প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে অসংগতি, ভ্যাট-কর সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া, মান যাচাই ছাড়া বিল পরিশোধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার।
আরও পড়ুন: ব্যালন ডি’অর জয়ের পর যেভাবে ব্যবসার মোড়ল হ্যারি কেইন
পিইডিপির আওতায় পিইডিপি-৩ প্রকল্প ব্যবহারে প্রায় ৫৮ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া সত্ত্বেও শতাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে বিলম্বে কাজ শেষ করার জরিমানা আদায় করা হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে এই জরিমানার বড় অংশ মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে ৫৮ কোটি টাকার অনিয়ম এবং কুমিল্লায় মোহাম্মদ নসরুলের বিরুদ্ধে ৬০ কোটি টাকার টয়লেট নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন: শ্রীমঙ্গলে মহাসড়কের পাশ থেকে উদ্ধার বিশাল অজগর
পানির গুণগতমান পরীক্ষা প্রকল্পে ২৪ কোটি টাকার বিল পরিশোধেও অনিয়ম ধরা পড়েছে।
পিরোজপুর এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে তদন্ত কমিটি জানিয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও তিনটি গাড়ি কেনা সংক্রান্ত ঘটনায় ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং গাড়ি মেরামতের টাকা চালকের হিসাবে দেওয়ার ঘটনায় ২৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া জনবল কাঠামোর বাইরে বেতন-ভাতা খাতে ৪৮ কোটি ১০ লাখ টাকার অনিয়ম হয়েছে এবং সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণে নকশা অমান্যসহ একাধিক কালভার্ট নির্মাণ না করেই ব্যয় দেখানো হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য অভিযোগগুলোর একটি পিরোজপুরে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে।
বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের রাজস্ব ও ভাড়া আদায়েও বড় ধরনের অনিয়ম দেখা গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে রোড কাটিং ফি থেকে আদায় করা অর্থের ভ্যাট জমা না দেওয়ায় দণ্ডসুদসহ ২ কোটি ৩২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। একই করপোরেশনের আরও কিছু কাজে ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার ভ্যাট জমার অনিয়ম রয়েছে। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, রংপুর ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্মাণকাজে মান যাচাই না করে ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৪৮ হাজার ২২৯ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রোড কাটিং ফি থেকে আদায় করা অর্থের ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় দণ্ডসুদসহ ২ কোটি ৩২ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। একই সিটি করপোরেশনের ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের আরও কিছু কাজ ও সেবার বিপরীতে ভ্যাট কর্তন এবং জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, রংপুর ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের নির্মাণকাজে নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষা না করেই ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৪৮ হাজার ২২৯ টাকার বিল পরিশোধের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বাজার, মার্কেট ও বিভিন্ন স্থাপনা থেকে ভাড়া আদায়ে ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, রংপুর, বরিশাল ও খুলনা সিটি করপোরেশনে প্রায় ১৮৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। পাশাপাশি ট্রেড লাইসেন্স ফি না নিয়ে ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং মার্কেট ও কমিউনিটি সেন্টারের ভাড়া আদায় না করে ৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকার অনিয়ম করা হয়েছে। রংপুর সিটি করপোরেশনে প্রকল্পের অব্যবহৃত ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত না দিয়ে অন্য তহবিলে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
সাবেক মেয়রদের বিরুদ্ধেও গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে, এছাড়া হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার সঙ্গে মিলে ৬৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকার অনিয়মে তাঁর নাম এসেছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকা এবং ঢাকা দক্ষিণের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের মেয়াদকালে নিয়োগ-বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
তদন্ত কমিটি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার অডিট রিপোর্ট এবং মহাহিসাব নিরীক্ষকের নথি পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। প্রতিবেদনে শুধু আর্থিক ক্ষতির পরিমাণই উল্লেখ করা হয়নি, বরং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে অনিয়মের অভিযোগ মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়; অর্থের সঠিক পরিমাণ ও দায়ীদের নিশ্চিত করতে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও চূড়ান্ত তদন্ত আবশ্যক। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে পৃথক তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

















