সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করা হবে: আইজিপি

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। সোমবার দুপুরে রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’র ইসলামিক ব্যাংকিং সেবার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন। আইজিপি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা অপরাধ দমনে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী যে পদক্ষেপ প্রয়োজন, পুলিশ সেটিই গ্রহণ করবে। যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে আমরা সেটাই করবো। তবে আমরা আগে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করছি। গত দুই মাসে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের যোগ্যতা নিয়ে সমালোচনার জবাবে আইজিপি বলেন, ‘আপনারা বলেন অশিক্ষিত পুলিশ নিয়োগ দেন, কনস্টেবলের আবার কি জ্ঞান লাগে। ওর সঙ্গে ঝামেলা হলেই বলেন পুলিশ খারাপ। আমরা কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করি নাই। কোনো আনওয়ান্টেড ফোর্স অ্যাপ্লাই করি নাই— উল্লেখ করে আলী হোসেন ফকির বলেন, আপনারা দেখেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশে পুলিশের যে অবস্থা ছিল, পুলিশ রাস্তায় ডিউটি করতে ভয় পেতো, কোথাও যেতে সাহস পেতো না। সেই অবস্থা থেকে আমরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সুখী-সমৃদ্ধিময় বাংলাদেশ, আপনাদের প্রকৃত স্বস্তি, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেয়ার জন্য, আপনার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফেল করলে রাস্তায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের মারামারি হয়, ইন্ডাস্ট্রিতে বেতন না দিলে শ্রমিকের মারামারি হয় পুলিশের সঙ্গে। সংবিধানে পুলিশের কাজের চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স রয়েছে। আইজিপি তার বক্তব্যে মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি উল্লেখ করেননি। বাংলাদেশ পুলিশ মানবাধিকার সমুন্নত রেখে জনগণের জানমাল রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধী গ্রেপ্তার, অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় চারজন পুলিশ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। দেশের প্রচলিত আইন বিশেষ করে আত্মরক্ষার অধিকার, দণ্ডবিধি-১৮৬০, ফৌজদারী কার্যবিধি-১৮৯৮ এবং পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১-এ পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলা রয়েছে। ফ্যাসিস্ট আমলের কথা উল্লেখ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, এদেশের নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা ছিল না, বাকস্বাধীনতা ছিল না, বিনা বিচারে মানুষকে হত্যা করা হতো।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, কে আসবে বা আপা কবে আসবেন— এসব বিষয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের মূল দায়িত্ব হলো আইন ও সংবিধান মেনে যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, তা করা। তিনি আরও যোগ করেন, পুলিশকে এমপাওয়ার না করলে এবং যথাযথভাবে আইন প্রয়োগের সুযোগ না দিলে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: ইয়ামাল ও এমবাপ্পেকে হারিয়ে ব্যালন ডি’অর জিতলেন কেইন
নিজের বাহিনীর সমালোচনা নিয়ে আইজিপি বলেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ তাকে ফ্যাসিস্ট বলে, আবার পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকলে তাকে দুর্বল বলা হয়। পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যদের অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি বাহিনীর কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি দাবি করেন, গত ১৭ বছর ধরে যারা দেশ পরিচালনা করেছে, তাদের আমলেই পাড়ায়-মহল্লায় মাদকের বিস্তার ঘটেছে। অথচ এই কনস্টেবলই তৃণমূল পর্যায়ে আপনাকে সেবা দিচ্ছে।
নাগরিক সমাজের ১০১ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিবৃতির কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংবিধানের কোথাও লেখা নেই যে গোপনে মদ বা মাদক গ্রহণ করা কারো অধিকার। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনের আওতায় থাকা জরুরি। এছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর সোমবার এক প্রেস রিলিজের মাধ্যমে জানিয়েছে, অপরাধ দমন এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে অনেক সময় সরাসরি প্রতিরোধ ও আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়। তৎকালীন সরকারি দলের নেতারা মাদক থেকে মাসোহারা পেতেন এবং পুলিশেরও কিছু সদস্য এতে জড়িত ছিলেন। আপনি কি পুলিশ হাউজিংয়ের ভেতরে গোপনে গিয়ে মদ খাবেন, মাতলামি করবেন, কোকেন-হিরোইন গ্রহণ করবেন। স্বাধীনতা আছে বলে যা ইচ্ছা তা করতে পারবেন না, আইনের আওতায় থাকতে হবে। কিন্তু পুলিশেই সবথেকে বেশি শিক্ষিত লোক দরকার, কারণ তাকে সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে কন্ট্রোল করতে হবে।
আরও পড়ুন: আলিঙ্গনের চাপে ভাঙল পাঁজরের পাঁচটি হাড়, নেপথ্যে অস্টিওপোরোসিস
এদিকে, ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন, একজন আইজিপি হয়ে এ ধরনের বক্তব্য দেয়া তার চাকরিবিধির পরিপন্থি। তিনি অভিযোগ করেন, এটি দেশে ভয়ের সংস্কৃতি এবং গুম-খুন-ক্রসফায়ারের সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদী আমলের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর ইঙ্গিত।
অন্যদিকে, সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির আপত্তিকর মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। সোমবার সন্ধ্যায় ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, আইজিপি মন্তব্য করেছেন যে ‘মাদকের টাকা না পেলে সাংবাদিকরা পুলিশকে অকার্যকর বলছেন’। সংগঠনটি এটিকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থি বলে অভিহিত করেছে। একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সম্পর্কে আইজিপি’র মন্তব্য নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
বিবৃতিতে ডিআরইউ নেতৃবৃন্দ দাবি করেন, কোনো পুলিশ সদস্যের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে হবে। তারা আইজিপির বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার ও প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা না চাইলে তারা কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। গুজব ও মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্ত না হয়ে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করা জরুরি।
আইজিপি আরও বলেন, সমাজে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে হলে পুলিশের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, পুলিশকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করবেন না এবং নিজেরাও ব্ল্যাকমেইল হবেন না। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিয়ে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, আইজিপির এই বিতর্কিত বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিক মহল এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়েছে। একদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি এবং অন্যদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রধানের এমন কঠোর অবস্থান— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নতুন করে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।

















