দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সম্প্রতি একের পর এক টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। দিনদুপুরে প্রকাশ্যে কিংবা রাতের অন্ধকারে সুপরিকল্পিতভাবে সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষকে হত্যার ঘটনা ঘটছে। গত ১০ দিনে সারাদেশে অন্তত সাতজনকে গুলি করে ও কুপিয়ে প্রাণনাশের ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। সাংবাদিক থেকে রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ কেউ রেহাই পাচ্ছেন না। দিনের আলো ফোটার আগেই এমন হত্যাকাণ্ড নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এরপর তারা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এ ঘটনায় তাফসির আলম শাওন (২২) নামের আরেক যুবদলকর্মী গুরুতর আহত হন। আত্মরক্ষার চেষ্টা করেও তারা হামলাকারীদের হাত থেকে রেহাই পাননি। গুলি ছোড়ার পর তারা খালের পানিতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।
আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌযান ও গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান কাতার-ফ্রান্সের
সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার ভোরে খুলনা নগরের পূর্ব-বানিয়াখামার এলাকায়, যেখানে তাওহিদুল ইসলাম (৩২) নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার দিন ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে সদর থানার ওই এলাকার আনসার আলী গলির সামনে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এর একদিন আগে বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি জহির ফকিরকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের ভাগিনা ইসমাইল হোসেন জানান, স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে বিরোধ এবং আসন্ন ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে তার নাম আলোচনায় থাকাতেই এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই দিনে বুধবার ভোরে মাগুরা পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাকের হোসেনকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। মাগুরা বাস টার্মিনালের একটি কাউন্টার থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতে জহির ফকির নিজের ফার্মেসি বন্ধ করে বাসায় ফেরার পথে ১৫/২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ তার পথ আটকে দেন। পরে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
টার্গেট কিলিংয়ের তালিকায় আরও রয়েছে ১৫ই অক্টোবর নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলায় বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার প্রতিনিধি সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের হত্যাকাণ্ড। রাতে তেলনজিয়া গ্রামের এক দোকানের সামনে দুই যুবক তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে তিনি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এছাড়া, ১৬ই অক্টোবর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আধিপত্য বিস্তার ও ব্যবসা সংক্রান্ত বিরোধে তারেক হোসেন বাপ্পি নামের এক যুবদল কর্মীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সাদ্দামের কার্যালয়ের সামনে অস্ত্রধারীরা তাকে ঘিরে ধরে নৃশংস হামলা চালায় এবং গুলি করে পালিয়ে যায়। সীতাকুণ্ডে যুবদলকর্মীকে গুলি করে হত্যা: গত ১৬ই অক্টোবর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বালু ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তারেক হোসেন বাপ্পি (২৬) নামের এক যুবদল কর্মীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রাত সোয়া আটটার দিকে দুর্গাপুর পৌরসভার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া গ্রামের একটি দোকানের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। ঘটনার সময় তিনি তেলনজিয়া বাজারে শ্বশুরবাড়ির কাছে একটি দোকানে চা পান করে বের হচ্ছিলেন।
আরও পড়ুন: ওসিকে রুমিন ফারহানা: আপনি বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন
এছাড়া ১২ই অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের বউবাজার এলাকায় দিনে-দুপুরে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাহেব আলী (৪৫)-কে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি পাশের খালে পড়ে গেলে হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে আরও গুলি চালায়। সাহেব আলীর বিরুদ্ধে হত্যা ও ডাকাতিসহ অন্তত ২০টি মামলা ছিল। ১৬ই অক্টোবর রাজবাড়ীতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ১৪ মামলার আসামি পিয়ারুল ইসলামকে মসজিদে নামাজ পড়ে ফেরার পথে গুলি করে হত্যা করা হয়। হেলমেট ও মাস্ক পরা হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে এসে এই হামলা চালায়; নিহত পিয়ারুলের বিরুদ্ধে হত্যা ও ডাকাতিসহ অন্তত ১৫টি মামলা ছিল। পরবর্তীতে স্থানীয়রা আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। ১৬ই অক্টোবর রাত পৌনে ৮টার দিকে রাজবাড়ীতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে ১৪ মামলার আসামি পিয়ারুল ইসলাম (৩০) নামে ব্যক্তি নিহত হন। গুলির শব্দে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা কিছুটা দূরে রাখা মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। পিয়ারুল বাড়ি থেকে বের হয়ে সজ্জনকান্দা পূর্বপাড়া জামে মসজিদে এশার নামাজ পড়তে যান।
এ বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির স্পষ্ট ইঙ্গিত। তিনি বলেন, বস্তুনিষ্ঠ নির্দেশকের চেয়ে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে অপরাধীরা পার পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। হত্যাকাণ্ড ও সংঘাতের ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে তিনি মত দেন।
তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) কামারুম মুনিরা জানান, বিগত বছরের তুলনায় বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। অপরাধীদের হাতে অস্ত্র কীভাবে পৌঁছাচ্ছে, তা খুঁজে বের করতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।






















