ফ্রান্সের শিক্ষার্থী আন্দোলনে ‘বিসমিল্লাহ’ স্লোগানের পেছনের রহস্য

ফ্রান্সে চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলনের একপর্যায়ে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ নামক একটি রহস্যময় স্লোগান ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ দুইয়ের মিশেলে তৈরি হয়েছে স্লোগানটি। এই বিক্ষোভই পরে ব্যাপক অস্থিরতায় রূপ নেয়।
গত সপ্তাহে লাখ লাখ শিক্ষার্থী যখন তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার দাবিতে রাজপথে নেমে আসেন, তখন তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে এই বাক্যটি নজর কাড়ে। তবে এর আক্ষরিক অর্থের চেয়ে তাৎপর্য অনেক বেশি।
আরও পড়ুন: হরমুজে মার্কিন নৌ অবরোধের নিন্দা ও জাতিসংঘে ইরানের নালিশ
আরবি শব্দ ‘বিসমিল্লাহ’ (আল্লাহর নামে) এবং ফরাসি বাক্যাংশ ‘সে লে তেনেব্র’ (এটি অন্ধকার)-এর এই অদ্ভুত সংমিশ্রণ আপাতদৃষ্টিতে অস্পষ্ট মনে হলেও, এর নেপথ্যে রয়েছে পুলিশের নজরদারি ও তরুণদের প্রতি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির এক গভীর সামাজিক সংঘাত। বাক্যটির অর্থ আপাতদৃষ্টিতে অস্পষ্ট মনে হতে পারে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় স্ন্যাপচ্যাটে ছড়িয়ে পড়া কিছু বার্তা থেকে। শিক্ষার্থী আন্দোলনের একটি ব্যক্তিগত চ্যাট গ্রুপে কোনো এক ব্যক্তি বারবার বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন। ওই বার্তায় বলা হয়, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র—আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব।’ এই বার্তাগুলোতে আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজি ও ‘মামাদু’ কিংবা ‘আবদেল্লাহ’-এর মতো নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। তরুণদের কাছে এই ভাষাটি কৃত্রিম ও হাস্যকর ঠেকায় তারা সন্দেহ করছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশের উদ্দেশ্যে ছদ্মবেশে এসব বার্তা পাঠিয়েছিল।
আরও পড়ুন: ফ্রান্সে বিক্ষোভ সামলাতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সেনা মোতায়েনের ঘোষণা
শিক্ষার্থীদের ধারণা, আন্দোলন দমানোর জন্য কর্তৃপক্ষ যেভাবে তরুণদের কথ্যরীতির অনুকরণ করার চেষ্টা করেছে, তা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতাকে উপহাস করতেই বিক্ষোভকারীরা স্লোগানটিকে নিজেদের আন্দোলনের প্রতীকে রূপ দিয়েছেন। এটি এখন পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে আসা অভিবাসী পরিবার, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত ফরাসিরা দীর্ঘদিন ধরেই বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা বলে আসছেন। তাদের ধারণা, তরুণদের কথাবার্তার ধরন অনুকরণ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হাস্যকরভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও বর্ণগত সংখ্যালঘুদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্কের টানাপোড়েন এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
এ বিষয়ে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো নির্দিষ্ট এজেন্টের সম্পৃক্ততার কথা সরাসরি স্বীকার করেনি। তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে এবং তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের সুবিধার্থে তদন্তকারীরা কখনো কখনো অনলাইনে ছদ্মনাম বা ছদ্মপরিচয় ব্যবহার করে থাকেন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, সরকার তাদের আন্দোলনের মূল বাস্তবতা এবং নতুন প্রজন্মের ভাষাকে বোঝার ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। ফ্রান্সের একটি ছাত্র সংগঠনের মুখপাত্র সাবরিন খারবাখ সরাসরি মন্তব্য করেছেন যে, কোনো ফরাসি তরুণ এভাবে কথা বলে না। তার মতে, এই স্লোগান ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের ওপর নজরদারি বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা তাদের চোখ এড়ায়নি। বরং সব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তারা যে নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম, সেটিই স্লোগানের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে।
বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী সাদানি সাবাদি মনে করেন, স্ন্যাপচ্যাটের ওই বার্তাগুলোতে একধরনের পূর্বধারণা স্পষ্ট ছিল। কর্তৃপক্ষ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, যারা অবরোধ সৃষ্টি করছে বা ভাঙচুর করতে চাচ্ছে, তারা নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর মানুষ। এই বর্ণবাদী ও সংকীর্ণ মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটেছে তাদের তথাকথিত ‘ছদ্মবেশে’র ভাষার ব্যবহারে। বার্তাগুলোর ভাষা হাস্যকর মনে হওয়ায় স্ন্যাপচ্যাটের অন্য ব্যবহারকারীরা সেগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তবে বার্তাগুলোর প্রকৃত উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।


















