মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় কমছে কর্মী গমন, সংকটে শ্রমবাজার

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তবে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চলমান আঞ্চলিক সংঘাত, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতির কারণে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে গিয়েছিলেন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন বাংলাদেশি। চলতি বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ জন কমে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩-এ দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার প্রায় ৩৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশি বিদেশে যান। চলতি বছরের ২১শে অক্টোবর পর্যন্ত বিএমইটি থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েছেন ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন। সম্প্রতি হুতিদের হামলায় সৌদি আরবে শ্রমবাজারে টালমাটাল অবস্থায় পড়েছে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষরা। ঘুরে ফিরে কয়েকটি দেশের ওপরই নির্ভরতা: প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০৩টি দেশে কর্মী পাঠানো হয়েছে।
সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে কর্মী গমনের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।
আরও পড়ুন: প্রতিরক্ষা খাতে নতুন জোট: কাতার, তুরস্ক
বিএমইটির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে দেশটিতে গিয়েছিলেন ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ জন, যা চলতি বছরের একই সময়ে কমে ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭-এ নেমেছে। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জনই সৌদি আরবে। চিরচেনা পরিবেশে ফিরে স্বস্তি মিললেও মন জুড়ে জমে আছে আক্ষেপ।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশে ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান
এটি আগের বছরের তুলনায় ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ কম। শুধু সংখ্যা নয়, বর্তমানে সৌদি আরবে আকাশপথে যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা ও সংঘাতের কারণে প্রবাসীরা মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ছুটিতে দেশে এসে অন্তত ২০ হাজার প্রবাসী আটকা পড়েছেন। রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট বন্ধ থাকায় অনেককে জেদ্দা হয়ে বাড়তি খরচে যাতায়াত করতে হচ্ছে। জেদ্দা থেকে ফেরা প্রবাসী সুবল দাসের ভাষ্যমতে, মাত্র একদিনের ব্যবধানে টিকিটের দাম ৬০০ থেকে ৭০০ রিয়াল পর্যন্ত বেড়েছে, যা প্রবাসীদের জন্য বাড়তি চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিয়াদ থেকে ফেরা আতিয়ার মণ্ডল জানান, রিয়াদগামী ফ্লাইট বন্ধ থাকায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জেদ্দা হয়ে তাকে ফিরতে হয়েছে। এছাড়া স্থানীয়ভাবেও মিসাইল আতঙ্কে প্রবাসীরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছেন না। সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে ঢাকায় আসা প্রবাসী সুবল দাস বলেন, দীর্ঘ ১৫ মাস পর দেশে ফেরা। দু’দিন আগেও দেশে আসার টিকিটের দাম ছিল ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার রিয়াল। যারা সৌদি আরবে অবস্থান করছেন, তাদের প্রতি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে। পাশাপাশি এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াতেও ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। পরে বাধ্য হয়ে জেদ্দা থেকে নতুন করে টিকিট কাটতে হয় তাকে। রিয়াদ থেকে বাসে মক্কা, সেখান থেকে আবার বাসে জেদ্দায় পৌঁছান। রিয়াদে থাকা আরেক প্রবাসী নাজমুল ইসলাম বলেন, প্রতি মুহূর্ত মিসাইল আতঙ্ক নিয়ে কাজে যাই। যারা দেশে গেছেন তাদেরও ফেরা নিয়ে নানা দুশ্চিন্তা কাজ করছে। এ সময়ে বিদেশে যাওয়া ১ কোটি ১০ লাখের বেশি কর্মীর প্রায় ৭৯ শতাংশ গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে; ৯৪ শতাংশের গন্তব্য ছিল ১০টি দেশ।
রেমিট্যান্স প্রবাহেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) ৮ হাজার ৫৯১ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজারও চাপের মুখে। দেশটিতে জুলাই মাসে গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় ৫৭ বাংলাদেশিকে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং এরপর থেকে ভিসা প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে সংকুচিত করা হয়। দেশটিতে বর্তমানে ১০ থেকে ১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি অবৈধ হয়ে পড়েছেন, কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলার ঘটনার ভিডিও প্রচার করায় এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করে অনেকের ভিসা বাতিল করা হচ্ছে। অন্যদিকে, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজার দীর্ঘদিন সীমিত থাকায় বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসছে। আগস্টে এসেছিল ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১লা জুলাই থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ৮ হাজার ৫৯১ মিলিয়ন ডলার, আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৭ হাজার ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদির সঙ্গে গত ১৩ই অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিনের বৈঠকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এতে ট্যাক্সি ও ট্রাকচালক নিয়োগ এবং দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। জাপানের সাথে চুক্তির আওতায় আগামী ১লা এপ্রিল থেকে কর্মী নিয়োগ শুরুর কথা রয়েছে, যা পাঁচ বছর মেয়াদী। তবে নতুন বাজারের সন্ধানে প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। কম্বোডিয়ায় কলসেন্টারে চাকরির প্রলোভনে অনলাইন প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে; বিএমইটির হিসাবে ২০২৫ সালে দেশটিতে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন ১২ হাজার ২৬৩ জন। একইভাবে রাশিয়াতেও ৪ হাজার ৭২৭ জন কর্মী গেছেন। তাদের অনেকেই কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করা অপরিহার্য। তিনি জানান, শুধু নতুন বাজারের নাম ঘোষণা যথেষ্ট নয়। এর জন্য চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের প্রস্তুত করা, সঠিক প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং দূতাবাসগুলোর সক্রিয়তা বাড়ানো জরুরি। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশ ৯৮টি দেশে ১০০ জন করেও কর্মী পাঠাতে পারেনি, বরং ৭৯ শতাংশ কর্মী মাত্র পাঁচটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে কার্যকর অভিবাসন কূটনীতি ও সঠিক পরিকল্পনাই এখন বড় পরীক্ষা। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের শ্রমবাজার নির্ভরতা, দক্ষ কর্মী তৈরিতে সীমাবদ্ধতা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি সংকট আরও বাড়াচ্ছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি, চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন ও কার্যকর অভিবাসন কূটনীতিতে জোর না দিলে কর্মসংস্থান, প্রবাসী আয় ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ।






















