ইরানে একা সামরিক হামলা চালাতে কতটা সক্ষম ইসরায়েল

ইরানের বর্তমান সরকারকে উৎখাত করাকেই এখন নিজের দেশের ‘প্রধান লক্ষ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে জনমত জরিপে নিজের অবস্থান কিছুটা নড়বড়ে হওয়ায় তিনি নতুন করে ইরানে সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিলেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, যদিও ইরানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলার মতো সামরিক শক্তি ইসরায়েলের আছে, কিন্তু শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করা বা চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করা কার্যত অসম্ভব। এর আগে জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন কমতে দেখা যাচ্ছে। ইরান ইতিমধ্যে দুই দফা হামলা মোকাবিলা করে টিকে আছে। ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস, নেতানিয়াহুকেও সরিয়েছিলেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে যে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ চেয়ে আসছিলেন, তা বাস্তবে রূপ নেয়। ভালোভাবে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রব্যবস্থাগুলো টিকে যাবে।’। পুরোনো চীনা জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের (এএসসিএম) বড় অংশই এখন ইরান নিজ দেশে তৈরি করে। এ ছাড়া ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়গুলো বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার প্রাকৃতিক আশ্রয় হিসেবে কাজ করে।’। এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে ইরানে হামলার বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে ওয়াশিংটন।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে স্থল অভিযান ছাড়া শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তুরস্কের কায়সেরি শহরের আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক চাগলার কুরচ মনে করেন, আকাশপথে হামলার মাধ্যমে ইরানের সামরিক শক্তি কিছুটা কমানো সম্ভব হলেও দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে হলে কয়েক বছর মেয়াদি সেনা মোতায়েন ও দখলের প্রস্তুতি প্রয়োজন। নেতানিয়াহু নিজেও গত মার্চে স্বীকার করেছিলেন যে, শুধু বিমান হামলা দিয়ে সরকার পতন ঘটানো যায় না, এর জন্য স্থল অভিযান অপরিহার্য। যদিও তিনি সেই স্থল অভিযানের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো প্রকাশ করেননি। এমন পরিস্থিতিতে তিনি ইরানে আবার হামলা চালানোর আভাস দিয়ে এ কথা বলেছেন। এ ছাড়া আকাশে যুদ্ধবিমানে জ্বালানি ভরার সক্ষমতাও রয়েছে দেশটির।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) গবেষক আরবান কনিংহামের মতে, ইসরায়েলের কাছে বিপুল অস্ত্রের মজুত থাকা সত্ত্বেও কিছু বিশেষ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সক্ষমতা তাদের নেই। সেখানে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসনের সঙ্গে উগ্র জঙ্গিবাদের মেলবন্ধন ঘটেছে।’।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশে ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান
বিশেষ করে পাহাড়ের অনেক গভীরে থাকা ইরানের সামরিক ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অস্ত্রের প্রয়োজন হয়।
উদাহরণস্বরূপ, ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের জিবিইউ-৫৭ বাংকারবিধ্বংসী বোমার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
এর আগে ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমান থেকে ইরানের নাতাঞ্জ ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় এই বোমা ফেলা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: তিব্বতে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১৮ জনের প্রাণহানি
এ ধরনের সক্ষমতা কেবল যুক্তরাষ্ট্রেরই রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত ওই উদ্যোগ আর এগোয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইসরায়েল সফর করেছেন। তবে এই আলোচনার পর নেতানিয়াহু সরকার উৎখাতের হুংকার দিলেও, ইরানে নতুন কোনো অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নিতে রাজি কি না, তা নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াতে কতটা আগ্রহী, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে, কারণ ইরানের সরকারকে বাধ্য করার মতো কোনো কার্যকর পথ এখনো তাদের জানা নেই। ইরান যুদ্ধে চার মাসেই অন্তত ৫২টি যুদ্ধবিমান–ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
নেতানিয়াহু ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইরানের নেতৃত্বকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। সেই বছরের জুলাইয়ে মার্কিন কংগ্রেসেও তিনি একই সুর তুলেছিলেন। এরপর দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ২০২৫ সালের জুন এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ চালায়। এরপর থেকে ইরান নানা অবরোধের মুখে থাকলেও তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ওই বছরের জুলাইয়ে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘এসব শাসনব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো ইরানের শাসনব্যবস্থা। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল আরও একঘরে হয়ে পড়তে পারে।
কনিংহাম আরও সতর্ক করেছেন যে, গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গোপন অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একবার এসব গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে ইরানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সেগুলো চিহ্নিত ও নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে পারে। এছাড়া ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো সক্ষমতা স্থানীয় কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। কনিংহাম গোয়েন্দা কার্যক্রমে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপায় ও নেটওয়ার্ককে ‘একবার ব্যবহার করেই হারানোর ঝুঁকিতে থাকা সম্পদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধে কুর্দি বা বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নিয়েও তাঁর সংশয় রয়েছে। গত মার্চে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সক্রিয়ভাবে আলোচনা করছে। কুর্দি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে সিএনএন এ তথ্য জানিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে সংঘাত বাড়ানো থেকে বিরত থাকার চাপে রয়েছেন ট্রাম্প।
ইরানের সক্ষমতার দিকটি বিবেচনা করলে দেখা যায়, তাদের হাতে এখনো বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। রুসির জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল জানিয়েছেন, ইরানের লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ইসরায়েলের জন্য বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। গত কয়েক দফার যুদ্ধে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে গিয়ে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত অনেকাংশে কমে গেছে।
আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে ইসরায়েল দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের চাপে পড়বে। ইরানের তৈরি তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে ইসরায়েলকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করতে হয়। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ক্ষেত্রে ইরানকে বাড়তি সুবিধা দেয়। কনিংহাম মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইসরায়েল যদি এককভাবে আক্রমণ চালায়, তবে ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাবে। দেশটি শুধু ইসরায়েল নয়, উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতেও হামলা চালাতে পারে।


















