ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি: যেভাবে পরিসংখ্যান থেকে হারিয়ে যায় রোগীরা

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় আধুনিক যুগে আমরা যে গাণিতিক কৌশলের ওপর ভরসা করি, তার নাম ‘ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি’। মার্কিন কম্পিউটার বিজ্ঞানী সিনথিয়া ডোয়ার্ক ২০০৬ সালে প্রথম এই ধারণার গাণিতিক ভিত্তি স্থাপন করেন। বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ডেটাবেজ বা বড় আকারের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এটি একটি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তির একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে, যা বিশেষ করে বিরল রোগে আক্রান্ত বা ছোট জনগোষ্ঠীর তথ্যের ক্ষেত্রে মারাত্মক বিকৃতি ঘটাতে পারে।
ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসির মূল প্রক্রিয়াটি বেশ কৌশলী। এই নয়েজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে একটি প্যারামিটার।
যখনই কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্নের বিপরীতে ডেটাবেজ থেকে তথ্য নেওয়া হয়, তখন মূল উত্তরের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ‘নয়েজ’ বা এলোমেলো সংখ্যা যোগ করে দেওয়া হয়। কারণ, তাদের জনসংখ্যা কম হওয়ায় তা বেঁধে দেওয়া সীমার নিচে পড়ে গেছে।
আরও পড়ুন: মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যের ডাক দিলেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান
এর ফলে কোনো একক ব্যক্তির রেকর্ড আলাদাভাবে শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা গোপনীয়তা নিশ্চিত করে।
তবে এই নয়েজ যোগ করার প্রক্রিয়াটি গাণিতিকভাবেই কিছু ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করে।
যেমন, কোনো একটি এলাকায় বিরল কোনো রোগে আক্রান্ত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা যদি ৫ হয়, তবে প্রাইভেসি সেটিংসে নয়েজ যুক্ত করার ফলে সেই সংখ্যাটি ভুলবশত ২ অথবা ৯ হিসেবে দেখা দিতে পারে। কোনো এক জেলায় বছরে মাত্র সাত-আটজন রোগী বিরল কোনো এক জটিলতায় ধরা পড়ছে। সংখ্যাটা খুব ছোট, কিন্তু ওই সাত-আটজন মানুষের জন্য এটাই তাঁদের পুরো বাস্তবতা। তাই একে বাংলাদেশের নিজস্ব ও আসল ডেটা দিয়ে একটি চিন্তার পরীক্ষা হিসেবে দেখা যাক।
আরও পড়ুন: সিরিয়ায় জর্ডানের বিমান হামলায় শিশুসহ অন্তত ৭ জন নিহত
বড় জনসংখ্যার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য নগণ্য হলেও ছোট জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এটি ভুল তথ্যের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই বৈষম্যের বিষয়টি মেশিন লার্নিং মডেলে ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো প্রমাণ করেন নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গবেষক ইউজিন বাগদাসারিয়ান ও তাঁর সহকর্মীরা। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ডেটাসেটে যেসব তথ্যের উপস্থিতি বেশি, প্রাইভেসি-সুরক্ষিত মডেল সেগুলো ৯৮-৯৯ শতাংশ নির্ভুলতায় শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু যে তথ্যের নমুনার সংখ্যা কম, সাধারণ মডেল যেখানে ৯৭ শতাংশ নির্ভুলতা দেখাতে সক্ষম, সেখানে প্রাইভেসি-সুরক্ষিত মডেলটি মাত্র ৭৭ শতাংশ নির্ভুল ফল দিতে পারে। অর্থাৎ তথ্যের স্বল্পতাই এখানে বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে আসে। যে সংখ্যাটার ছবি ডেটাসেটে বেশি ছিল (যেমন ‘২’), দুটি মডেলই সেটা প্রায় সমান নির্ভুলতায় (৯৮-৯৯ শতাংশ) চিনতে পেরেছিল। কিন্তু যে সংখ্যার ছবি কম ছিল (যেমন ‘৮’-এর মাত্র ৫০০টি নমুনা), সাধারণ মডেল সেটা ৯৭ শতাংশ নির্ভুলতায় চিনতে পারলেও প্রাইভেসি-সুরক্ষিত মডেলটি চিনতে পেরেছিল মাত্র ৭৭ শতাংশ।
আদমশুমারির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরো প্রথমবারের মতো ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির জে টি মিউলার এবং পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির আলেকজান্ডার আর সান্তোস-লোজাদার ২০২২ সালের গবেষণায় দেখা যায়, ছোট ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উপাত্তে এই পদ্ধতিতে ব্যাপক অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে মার্কিন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও। মিনিয়াপোলিস ফেডারেল রিজার্ভের একটি গবেষণা বলছে, প্রায় ৮০ শতাংশ উপজাতি গোষ্ঠী আগে তাদের বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক যে নিখুঁত তথ্য পেত, নতুন নিয়মে তা আর পাওয়া যাচ্ছে না। হুবহু একই জিনিস ঘটেছে স্বাস্থ্যের হিসাবের ক্ষেত্রেও।
স্বাস্থ্যখাতের তথ্যে এর প্রভাব আরও উদ্বেগের কারণ। হাওয়ার ও সান্তোস-লোজাদার ২০২১ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি প্রয়োগের ফলে কোভিড-১৯-এর বয়সভিত্তিক মৃত্যুহারে বড় ধরনের বিকৃতি ঘটে, যা বাস্তবতার চেয়েও অনেক বেশি বা অস্বাভাবিক হার প্রদর্শন করে। কাউন্টি পর্যায়ের ৪০ শতাংশ বয়স-লিঙ্গ গ্রুপ এবং ৬০ শতাংশ জাতিগত গ্রুপ এই বিকৃতির শিকার হয়। এছাড়া কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর তথ্যে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় এই প্রভাব আরও বেশি প্রকট বলে ২০২০ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে। হাওয়ার ও সান্তোস-লোজাদার ২০২১ সালের গবেষণা দেখিয়েছে, ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি প্রয়োগ করলে কোভিড-১৯-এর বয়সভিত্তিক মৃত্যুহারে এমন বিকৃতি আসতে পারে যে হিসাব করা মৃত্যুহার ১০০ ভাগের বেশিও দেখাতে পারে। সান্তোস-লোজাদা, হাওয়ার্ড ও ভার্ডেরির ২০২০ সালের আরেকটি গবেষণা আরও নির্দিষ্ট করে দেখিয়েছে, এই বিকৃতি শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর মৃত্যুহারের হিসাবে বেশি প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশে এখনো জাতীয় পর্যায়ে ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার না থাকলেও, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে যদি বিরল কোনো রোগের তথ্য বা জেলাভিত্তিক জটিল স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এই পদ্ধতিতে প্রকাশ করা হয়, তবে উপরের গবেষণাগুলোর মতো একই ধরনের বিকৃতি ঘটার ঝুঁকি থেকে যায়। বিশেষ করে ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মতো পরিস্থিতিগুলোর ক্ষেত্রে সঠিক পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অপরিসীম। যেকোনো গাণিতিক সুরক্ষাই তখনই যুক্তিযুক্ত, যখন আমরা বুঝতে পারি যে প্রতিটি ছোট সংখ্যার আড়ালে বাস্তব মানুষ রয়েছেন, যারা পরিসংখ্যানের ভুলে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারেন। এখন কল্পনা করুন, এই ডেটাবেজে রোগীর পরিচয় গোপন রাখার জন্য একটা গাণিতিক পদ্ধতি বসানো হলো, যার কাজ হলো প্রতিটি সংখ্যার সঙ্গে সামান্য একটু এলোমেলো ‘শব্দ’ বা ‘নয়েজ’ যোগ করে দেওয়া। ডেটাবেজ তখনো ঠিকই ‘গোপনীয়’ থাকে, কিন্তু ওই জেলার রোগীরা যেন কাগজে-কলমে অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। সমস্যাটা হলো, যে গণিত আমাদের গোপনীয়তা রক্ষা করে, সেটিই কিছু মানুষকে পরিসংখ্যানের জগৎ থেকে একেবারে মুছে দিতে পারে। কম্পিউটারের ক্যাবলের মাথায় প্লাস্টিকের মোটা অংশ থাকে কেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অদৃশ্য বৈষম্য ও আমাদের ভবিষ্যৎ। তার ফলাফল ছিল ঠিক এই নমুনারই একটি বাস্তব সংস্করণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি গান বানাতে পারে। কিন্তু দেশ যেটাই হোক না কেন, গণিতটা তো একই থাকবে।
ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসির প্রভাব নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণাসমূহ
- Bagdasaryan, E., Poursaeed, O., & Shmatikov, V. (2019). Differential Privacy Has Disparate Impact on Model Accuracy. Advances in Neural Information Processing Systems (NeurIPS), 32, 15479–15488.
- Mueller, J. T., & Santos-Lozada, A. R. (2022). The 2020 US Census Differential Privacy Method Introduces Disproportionate Discrepancies for Rural and Non-White Populations. Population Research and Policy Review, 41(4), 1417–1430.
- Hauer, M. E., & Santos-Lozada, A. R. (2021). Differential Privacy in the 2020 Census Will Distort COVID-19 Rates. Socius, 7.
- Santos-Lozada, A. R., Howard, J. T., & Verdery, A. M. (2020). How Differential Privacy Will Affect Our Understanding of Health Disparities in the United States. Proceedings of the National Academy of Sciences, 117(24), 13405–13412.
- Gregg, M., Trostle, H., & Liebler, C. A. (2023). New 2020 Census Rules Make It Harder to Navigate Native American Data. Federal Reserve Bank of Minneapolis, Center for Indian Country Development, CICD Working Paper 2023-05.
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও গবেষণার তথ্য
- Bhowmik, K. K., et al. (2023). Recent outbreak of dengue in Bangladesh: A threat to public health. Health Science Reports, 6(4), e1210.
- Araf, Y., et al. (2024). Emerging health implications of climate change: dengue outbreaks and beyond in Bangladesh. The Lancet Microbe, 5(3), e213.
- এজেন্টিক এআই কীভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও তথ্যের সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতে আরও পরিবর্তন করতে পারে তা নিয়ে চলছে নতুন আলোচনা।





















