জাপানে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের সফর

বাংলাদেশ ও জাপানের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে চার দিনের সরকারি সফরে জাপানে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে টোকিও’র নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান জাপানের নাকাসোনে ইয়াসুতাকা, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সঙ্গে রয়েছেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও। এসব সাক্ষাতে উপস্থিত ছিলেন— অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রীকে সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রা সহকারে নিয়ে যাওয়া হয় ঐতিহাসিক ইম্পেরিয়াল হোটেলে। জাপান সফরকালে প্রধানমন্ত্রী এবং তার সফরসঙ্গীরা এই হোটেলে অবস্থান করবেন। এর আগে সোমবার দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে টোকিওর উদ্দেশ্যে রওনা দেন। প্রধানমন্ত্রী ১৭ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদেশে এটি হচ্ছে তারেক রহমানের তৃতীয় সফর। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গত সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্ক সফর করেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ও জাপানের সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই সফরকে প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফর হিসেবে বর্ণনা করছেন।
আরও পড়ুন: টানা তৃতীয়বার বিশ্বের সেরা তরুণ ফুটবলার লামিনে ইয়ামাল
প্রথম দিনের সফরসূচি ও গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
সফরের প্রথম দিনেই তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বে জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এবং দেশটির অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি। এসব সাক্ষাতে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, জাপানি বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন এবং দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় জাপানের সক্রিয় অংশগ্রহণ আরও জোরদার করার নানা সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়। একইসঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি, অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর অনুমোদন ও বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। উল্লেখ্য, গত ১১ই অক্টোবর ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মারুবেনি করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসায়ুকি ওমোতোর নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল।
জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আয়োজিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দেশের গভীর সম্পর্ক রক্ষায় ধারাবাহিক ভূমিকার জন্য তারো আসোকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান। এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ২০০৬ সালে জাপান সফরকালে বিএনপি’র তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তারো আসোর সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করেন। তারো আসো সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়ার দূরদর্শী নেতৃত্বের কথা স্মরণ করেন। তারেক রহমান বলেন, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, উপ-প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে তারো আসো বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে সব সময় ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভূমিকা রেখেছেন।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম বন্দরে ৩৯৩ পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
জাইকা প্রেসিডেন্টের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা
একই দিনে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। টোকিওতে স্থানীয় সময় সোমবার বিকেলে আয়োজিত এই বৈঠকে মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন জানান, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জাইকা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে তার ঢাকা সফরের চমৎকার অভিজ্ঞতা এবং ফলপ্রসূ আলোচনার বিষয়টি স্মরণ করেন। বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির স্বার্থে জাইকার দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য প্রধানমন্ত্রী গভীর কৃতজ্ঞতা জানান।
- জাপানের বাণিজ্যিক সহায়তা ও কারিগরি সাহায্যে চলমান দেশের বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে বাস্তবায়নের জোর তাগিদ দেওয়া হয়।
- বাংলাদেশের টেকসই আর্থসামাজিক অগ্রগতি ও দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি অর্জনে জাইকার পক্ষ থেকে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনরায় ব্যক্ত করা হয়।
- জাপানি প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়াতে জাইকার ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রেস ব্রিফিং ও প্রস্তাবনা
প্রথম দিনের বৈঠকগুলো শেষে টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাব্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সার্বিক তথ্য তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, দেশের সামগ্রিক টেকসই প্রবৃদ্ধির স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দক্ষতা উন্নয়নে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জাপানি সহযোগিতা, উচ্চপ্রযুক্তির প্রযুক্তি নগরী ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনী নগরী প্রতিষ্ঠা এবং কৃষি খাতের দ্রুত আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। এ ছাড়া কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ব্যাপক জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতেও জাপানের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এসব বৈঠকে রাজনৈতিক সুসম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা কাজে লাগানো, জাপানি ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উন্নত উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সার উৎপাদন খাতে জাপানের। নতুন সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে হালকা প্রকৌশল শিল্পেও বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বের সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক
মঙ্গলবারে এই সফরের মূল আকর্ষণে পরিণত হয় জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক। টোকিওস্থ জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কান্তেইয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন তারেক রহমান। জাপানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা, বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা করা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব প্রসারে দুই দেশের শীর্ষ নেতা একযোগে কাজ করার ঘোষণা দেন। দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ আলোচনা শেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানার্থে আয়োজিত এক বিশেষ সরকারি মধ্যাহ্নভোজ অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক) ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
সম্মানসূচক নৈশভোজ ও সংবর্ধনা
প্রথম দিনের কর্মসূচির সমাপনী পর্বে জাপানের নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সম্মানসূচক চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার আয়োজনে আয়োজিত বিশেষ নৈশভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের মন্ত্রী, উর্ধ্বতন উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারীরা উপস্থিত ছিলেন। সফরের মাধ্যমে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অংশীদারিত্ব আরও দৃঢ় ভিত্তি লাভ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।





















