ডায়েট করেও ওজন কমছে না? যে ৯টি ভুল হতে

অনেকেই ওজন কমানোর জন্য কঠোর ডায়েট পরিকল্পনা অনুসরণ করেন, কিন্তু আশানুরূপ ফল পান না। কেউ কেউ ডায়েট শেষ করার পরই দ্রুত আগের ওজনে ফিরে যান। ডায়েট করেও কেন ওজন কমে না বা কমানো ওজন কেন ধরে রাখা যায় না, তার পেছনে বেশ কিছু সাধারণ ভুল ও অসংগতি দায়ী। সঠিক ও কার্যকর উপায়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে নয়টি সাধারণ ভুল সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। বন্ধু, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারের ডায়েট পরিকল্পনা দেখে অনেকেই তা অনুসরণ করতে শুরু করেন।
প্রথম ভুলটি হলো দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকা। অনেকে দ্রুত ওজন কমানোর আশায় সকাল, দুপুর বা রাতের খাবার পুরোপুরি বাদ দেন। মনে রাখা প্রয়োজন, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এতে শরীরে ক্লান্তি আসে এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দেয়। দ্বিতীয়ত, ক্যালরি হিসাব করতে গিয়ে অনেকেই ভুল খাবার বেছে নেন। ভাত বাদ দিয়ে ওটস বা মুড়ি খাওয়ার প্রবণতা থাকলেও, এগুলো পরিমাণে বেশি খেলে ক্যালরি উল্টো বেড়ে যেতে পারে। তাই শুধু খাবার পরিবর্তন নয়, সুষম পুষ্টি ও পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। যেমন, কার্বোহাইড্রেট কমানোর জন্য ভাত বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে মুড়ি, ওটস বা নুডলস খেতে শুরু করেন। ফলে অন্যান্য সময়ে খাবার নিয়ন্ত্রণ করলেও মোট ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বাদামে ক্যালরি বেশি থাকে। বেসাল মেটাবলিক রেট (বিএমআর), অর্থাৎ বিশ্রামকালীন অবস্থায় শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণও ব্যক্তিভেদে আলাদা। সুস্থ থাকুন, সবল থাকুন, বাস্তবসম্মতভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন।
তৃতীয়ত, ডায়েটের পাশাপাশি বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া। সপ্তাহের অধিকাংশ দিন ডায়েট মেনে চললেও মাঝে মাঝে ফাস্ট ফুড, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস বা উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার খেলে ওজন কমানোর লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হয়। চতুর্থত, বিদেশি বা দামী খাবারের প্রতি অতিরিক্ত মোহ। ওজন কমানোর জন্য চিয়া সিড, অলিভ অয়েল বা অ্যাপল সাইডার ভিনেগারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে দেশি শাকসবজি, মাছ, মাংস ও ডাল খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পুষ্টিমান বজায় রেখে সুষম খাবার গ্রহণই আসল চাবিকাঠি। অথচ এসব খাবারের ক্যালরি নির্ভর করে পরিমাণ, উপকরণ ও প্রস্তুতপ্রণালির ওপর। ডায়েট মানে সপ্তাহের পাঁচ দিন কঠোর নিয়ম মেনে চলা আর বাকি দুই দিন ইচ্ছেমতো খাওয়া নয়। আমাদের দেশেই রয়েছে সহজলভ্য ও পুষ্টিকর নানা খাবার—শাকসবজি, মৌসুমি ফল, ডাল, ডিম, মাছ ও অন্যান্য প্রোটিনের উৎস।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলের স্বাধীনতা দিবসে মোদিকে আমন্ত্রন জানালেন নেতানিয়াহু
পঞ্চমত, কোনো খাবার পুষ্টিকর বলেই তা অতিরিক্ত খাওয়া যাবে না। বাদাম, ফল বা প্রোটিন স্বাস্থ্যকর হলেও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি গ্রহণ করলে ওজন বাড়তে পারে। ষষ্ঠত, ডায়েটের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার অভাব। কিছুদিন কঠোর ডায়েট করে আবার তা ছেড়ে দেওয়া ওজন নিয়ন্ত্রণের পথে বড় বাধা। জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই এমন খাদ্যাভ্যাস বেছে নিন যা দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা সম্ভব। সপ্তম ভুল হলো অন্যের অনুসরণ করা। সবার শারীরিক চাহিদা ও বিপাকীয় হার এক নয়, তাই নিজের প্রয়োজন বুঝে পুষ্টিবিদের পরামর্শে পরিকল্পনা করা উচিত। কারও কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু ফল বেশি খেলে পেট ফাঁপা বা অস্বস্তিও হতে পারে। আবার কিডনির ওপর প্রভাব নির্ভর করে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, খাদ্যগ্রহণ ও আগে থেকে কোনো রোগ আছে কি না, তার ওপর। বয়স, উচ্চতা, শারীরিক গঠন, দৈনন্দিন কাজকর্ম, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং বিপাকীয় চাহিদার ওপর নির্ভর করে খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত। মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও নেতিবাচক মনোভাবও খাদ্যাভ্যাস ও ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে।
অষ্টমত, শুধু ডায়েটের ওপর জোর দিয়ে শরীরচর্চা, ঘুম ও পানি পানের অভ্যাস উপেক্ষা করা। নিয়মিত ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত ঘুম ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ, নবম ভুলটি হলো ওজন কিছুটা কমলেই ডায়েট বন্ধ করে আগের খাদ্যাভ্যাসে ফিরে যাওয়া। ওজন কমানোর মতোই, কমানো ওজন ধরে রাখাও ডায়েটের সমান গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পর্যাপ্ত ঘুম ক্ষুধা ও তৃপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়ক। ফলে পুরোনো খাদ্যাভ্যাসে ফিরে যাওয়ার পর কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে হারানো ওজন আবার ফিরে আসতে পারে। ওজন কমলেই ডায়েটকে বিদায় জানানো।
জীবনযাত্রায় এই অভ্যাসগুলো যোগ করা জরুরি: প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন: ইংল্যান্ডের ৪২৯ রান টপকে শ্রীলঙ্কার অবিশ্বাস্য জয়
মিষ্টি, চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার এবং ক্ষতিকর চর্বি বর্জন করুন।
দিনে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট হাঁটা বা শরীরচর্চা করুন।
পাশাপাশি শরীর ও বয়সের ওপর ভিত্তি করে পর্যাপ্ত পানি পান করুন; অনেকের ক্ষেত্রে দিনে ৮ থেকে ১৪ গ্লাস পানি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
মনে রাখবেন, ওজন কমানো একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া।
তাই বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নিয়ে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়াই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
আয়শা আনিকা নাজনীন, পুষ্টিবিদ, প্রত্যয় মেডিক্যাল ক্লিনিক, বারিধারা।




















