উন্নত ক্যারিয়ার গড়তে যে ১০ বিদেশি ভাষা শেখা জরুরি

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে ক্যারিয়ারের সাফল্যের জন্য কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মূল ভিত্তি হলো ভাষা। বিভিন্ন সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর কাছাকাছি পৌঁছানোর সেরা উপায় হলো তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলা। বিদেশি ভাষা আয়ত্ত করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সহজেই বিশ্বনাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন। বিশ্বায়নের এই যুগে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন কর্মী খুঁজছে যারা আন্তর্জাতিকভাবে যোগাযোগে দক্ষ। তাই একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি দ্বিতীয় বা তৃতীয় কোনো ভাষা জানা ক্যারিয়ারে বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে। পারস্পরিক যোগাযোগের দক্ষতা শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাশিত বিষয়। কেননা কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের কাছাকাছি পৌঁছার সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো তাদের মানুষগুলো যে ভাষায় কথা বলে, তাদের সঙ্গে সে ভাষাতেই কথা বলা। সেই সঙ্গে সম্প্রদায়গুলো অভ্যস্ত হয়ে উঠছে একে অপরের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগে। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যৎ বিশ্ব নেতাদের চিহ্নিত করার জন্য শিক্ষার্থীদের যাচাই-বাছাই করে বিভিন্নভাবে। নিয়োগকর্তারা এমন লোক খোঁজেন, যাঁরা বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ফলে নির্দিষ্ট দেশের ভাষা আয়ত্তে একাডেমিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি চাকরি ক্ষেত্রেও মেলে বিস্তর সুযোগ–সুবিধা। পাবলিক খাতে কর্মজীবনে আগ্রহীদের জন্য কূটনীতি, বুদ্ধিমত্তা ও সামরিক ক্ষেত্রগুলোতে সক্রিয়ভাবে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
১. মান্দারিন: চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে বর্তমানে মান্দারিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। চীন ও তাইওয়ানের ৮১০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের মাতৃভাষা এটি। উৎপাদন, রপ্তানি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফিন্যান্সের মতো খাতে কাজের জন্য এই ভাষা সিভিতে যুক্ত করা প্রার্থীর মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। হংকং, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে এটি শেখার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ভাষাটি ইন্দোনেশিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, মঙ্গোলিয়া ও ফিলিপাইনেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান চীনা ভাষা শেখায়। এ ছাড়া অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, হল্যান্ড, লিচেনস্টাইন, লুক্সেমবার্গ ও সুইজারল্যান্ডেও ব্যাপকভাবে জার্মান বলা হয়।
২. জাপানিজ: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ জাপানের ভাষাভাষীর সংখ্যা ১২০ মিলিয়নেরও বেশি। প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস ও অটোমোবাইল শিল্পে জাপানের আধিপত্যের কারণে সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রচুর। রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা লজিস্টিকস খাতে যারা কাজ করতে চান, তাদের জন্য জাপানিজ ভাষা জানা বড় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। উৎপাদন ও রপ্তানিশিল্পে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগের উদ্ভব হওয়ায় মান্দারিনে দক্ষতার চাহিদা বেড়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য অভাবনীয় শিল্পের মধ্যে আছে ইঞ্জিনিয়ারিং, ফিন্যান্স ও লজিস্টিকস। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, ইলেকট্রনিকস ও অটোমোবাইল শিল্পের অত্যন্ত উন্নত স্তরের।
আরও পড়ুন: তৃতীয় মেয়াদে লড়তে আগ্রহী ডোনাল্ড ট্রাম্প, দাবি অধিকারের
৩. জার্মান: ইউরোপের বাজারে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে জার্মান ভাষা শেখাটা এগিয়ে থাকার কৌশল হতে পারে। জার্মানি ছাড়াও অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে ১০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ এ ভাষায় কথা বলেন। ইউরোপের বড় অর্থনীতির দেশে ফিন্যান্স, ফার্মাসিউটিক্যালস বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এটি শেখার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট ও গোথ ইনস্টিটিউট উপযুক্ত স্থান।
৪. তুর্কি: বিশ্বের প্রায় ৭৭ মিলিয়ন মানুষের মাতৃভাষা তুর্কি। জার্মানি, বলকান ও ককেশাস অঞ্চলে তুর্কি ভাষাভাষীর সংখ্যা অনেক। সাইবার নিরাপত্তা, এনার্জি, আইন এবং কূটনীতির মতো বৈচিত্র্যময় পেশায় তুর্কি ভাষা জানার সুবিধা পাওয়া যায়। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য তুরস্কে বিভিন্ন বৃত্তি ও ফেলোশিপের সুযোগ রয়েছে। বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৭৭ মিলিয়ন মানুষের মাতৃভাষা তুর্কি, যা একে বিশ্বের শীর্ষ ১৫টি সর্বাধিক কথ্য মাতৃভাষায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। তুরস্ক ছাড়াও তুর্কিভাষী আছে বলকান, ককেশাস ও পশ্চিম ইউরোপে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের শাসনকালে দেশীয় বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির তীব্র সমালোচনা করলেন ওবামা
৫. স্প্যানিশ: সারা বিশ্বে ৪৮০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলেন। এটি ২১টি দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আমেরিকার ক্রমবর্ধমান বাজারে মিডিয়া, ব্যাংকিং ও বিপণন খাতে এই ভাষার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রায় ৮৫ শতাংশ আমেরিকান নিয়োগকর্তা স্প্যানিশ জানাকে বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে দেখেন। শতকরা ৮৫ ভাগ আমেরিকান নিয়োগকর্তা স্প্যানিশকে সবচেয়ে বেশি চাহিদাযুক্ত বিদেশি ভাষা হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছেন। তেমনি কয়েকটি প্রয়োজনীয় বিদেশি ভাষার কথা নিয়ে আজকের আয়োজন।
৬. কোরিয়ান: দক্ষিণ কোরিয়া ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম উদ্ভাবনী দেশ। কে-পপ ও কোরিয়ান ড্রামার জনপ্রিয়তা বাড়ার সাথে সাথে ভাষাটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যারা প্রযুক্তি শিল্পে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য কোরিয়ান ভাষা শেখা হতে পারে একটি সঠিক সিদ্ধান্ত। বিশ্বায়নের গতিশীলতায় বহুজাতি সংস্কৃতিগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
৭. ফরাসি: আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে ফরাসি ভাষা অপরিহার্য। এটি ২৯টি দেশের প্রায় ২২০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের ভাষা। জাতিসংঘ, ন্যাটো ও ফিফার মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা এটি। আফ্রিকা ও কানাডায় এই ভাষার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
৮. আরবি: তৈল, জ্বালানি ও হাই-এন্ড কনস্ট্রাকশন খাতে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে আরবি ভাষা দক্ষতা আবশ্যক। বিশ্বের ২৭টি দেশে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন আরবি ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ব্যবসার প্রসারে এই ভাষা সিভিতে যোগ করা বড় সম্পদ হতে পারে। বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে এটি শেখা সম্ভব। সুতরাং গেজেট–সম্পর্কিত যেকোনো ব্যবসার জন্য জাপানিজ ভাষা শেখা অবধারিত।
৯. ইতালিয়ান: এই ভাষাটি প্রায় ৬৫ মিলিয়ন মানুষের মাতৃভাষা। ফ্যাশন, ডিজাইন, চারুকলা, ফুটবল এবং বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাণের মতো শিল্পের সঙ্গে যারা যুক্ত হতে চান, তাদের জন্য ইতালিয়ান ভাষা জানা অত্যন্ত সহায়ক। ল্যাম্বোর্গিনি বা আরমানির মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডে কাজের সুযোগ পেতে এই ভাষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
১০. রাশিয়ান: রাশিয়ার ক্রমবিকশিত অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো খনি, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন। প্রযুক্তিবিদ বা বিজ্ঞানীদের জন্য রাশিয়া একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট বা রুশ বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে এই ভাষা শেখা যায়। গত ১০–১২ বছরে কোরিয়া এশিয়ায় অধ্যয়নরত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ২৫০ মিলিয়ন রাশিয়ান ভাষা ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশির ভাগই বাস করে রাশিয়ায়।


















