আলিঙ্গনের চাপে ভাঙল পাঁজরের পাঁচটি হাড়, নেপথ্যে অস্টিওপোরোসিস

ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আলিঙ্গন মানসিক প্রশান্তি বয়ে আনে। কিন্তু সেই পরিচিত আলিঙ্গনই যদি গুরুতর শারীরিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা ভয়ের ও বিস্ময়ের বিষয়। সম্প্রতি চীনের জিয়াংসু প্রদেশে ঘটে যাওয়া এমনই এক ঘটনায় এক নারীর পাঁচটি পাঁজরের হাড় ভেঙে গেছে, আর একটি পাঁজরে দেখা দিয়েছে সূক্ষ্ম ফাটল।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ওয়াং নামের এক ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীকে ঠান্ডা লাগার কথা শুনে জড়িয়ে ধরেন। স্ত্রীকে উষ্ণতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা এই আলিঙ্গনের পর তিনি তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। এরপর তিনি মাটিতে বসে পড়েন এবং ব্যথার কারণে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানোও অসম্ভব হয়ে পড়ে। হাসপাতালে বুকের সিটি স্ক্যান করার পর পাঁচটি পাঁজর ভাঙার ভয়াবহ তথ্যটি বেরিয়ে আসে।
চিকিৎসকদের মতে, ওই নারীর হাড় অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল।
আরও পড়ুন: সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করা হবে: আইজিপি
তাঁর ওজন ৪৫ থেকে ৫০ কেজির মধ্যে। নিয়মিত কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণ, রাতের খাবার বর্জন, প্রচুর কফি পান এবং পর্যাপ্ত রোদ ও বাইরের পরিবেশের সংস্পর্শে না থাকাও তাঁর হাড়ের এই অবস্থার জন্য দায়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও ঠিক কোনটি কতটুকু প্রভাব ফেলেছে, তার সুনির্দিষ্ট মেডিকেল তথ্য নেই। তবে অস্টিওপোরোসিস যে হাড়ের শক্তি কমিয়ে দেয়, তা এখানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই নারীর ওজন ছিল ৪৫ থেকে ৫০ কেজি। তবে এসব অভ্যাসের কোনটি তাঁর হাড়ের দুর্বলতার জন্য কতটা দায়ী, তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো বিস্তারিত চিকিৎসা-তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ভাত বাদ নয়, ওজন নিয়ন্ত্রণে অনুসরণ করতে পারেন জাপানিদের ১২ অভ্যাস।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ) এর তথ্যানুযায়ী, অস্টিওপোরোসিস হলো এমন এক নীরব রোগ, যাতে হাড়ের খনিজ ঘনত্ব ও অভ্যন্তরীণ কাঠামো কমে যায়। ফলে সাধারণ আলিঙ্গন বা সামান্য চাপেও হাড় ভাঙার ঝুঁকি তৈরি হয়। পাঁজরের হাড় বুকের খাঁচা হিসেবে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের সুরক্ষায় কাজ করে। এই হাড়ের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা কমলে যেকোনো ধরনের অতিরিক্ত চাপে তা ভেঙে যেতে পারে।
এই রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ দায়ী। প্রথমত, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডির ঘাটতি। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত খাদ্যগ্রহণ বা প্রোটিনের অভাব। এছাড়া শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, কম ওজন এবং হরমোনের পরিবর্তন বিশেষ করে মেনোপজের পর নারীদের ক্ষেত্রে হাড়ের ক্ষয় দ্রুত হয়। অনেক সময় পারিবারিক ইতিহাসও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
আরও পড়ুন: ইরাকের উপকূলে অগ্নিকাণ্ডের কবলে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ
অস্টিওপোরোসিস প্রাথমিক অবস্থায় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ করে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হাড় ভাঙার পর রোগী জানতে পারেন যে তিনি এই রোগে আক্রান্ত। তবে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যেমন: সামান্য আঘাতে হাড় ভাঙা, মেরুদণ্ডের হাড়ের পরিবর্তন বা শারীরিক উচ্চতা কমে যাওয়া। ঝুঁকির কারণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে ডুয়াল-এনার্জি এক্স-রে অ্যাবজরপশিওমেট্রি বা ডিএক্সএ পরীক্ষার মাধ্যমে হাড়ের খনিজ ঘনত্ব যাচাই করা যেতে পারে।
হাড়ের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। দুধ, দই এবং কাঁটাসহ ছোট মাছ ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস। শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণের জন্য ভিটামিন ডি অপরিহার্য, যা সূর্যালোক ও নির্দিষ্ট খাবার থেকে পাওয়া যায়। এছাড়া ডিম, ডাল ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার পেশি ও হাড়ের শক্তি বাড়ায়। তবে কঠোর ডায়েট বা দীর্ঘস্থায়ী অনাহার এড়িয়ে চলা জরুরি।
নিয়মিত ব্যায়াম হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। হাঁটা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠা বা ভার বহনকারী ব্যায়াম হাড়কে মজবুত রাখে। তবে অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত বা উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য ব্যায়ামের ধরন ও তীব্রতা চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ঠিক করা উচিত। ধূমপান ত্যাগ করা এবং শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রাখাও হাড়ের ক্ষয় রোধে সহায়ক।
প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরা স্বাভাবিক ও নিরাপদ। এই একটি ঘটনা থেকেই আলিঙ্গনকে বিপজ্জনক ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে বয়স্ক ব্যক্তি বা অস্টিওপোরোসিসের রোগী যাদের হাড়ের সুরক্ষা ঝুঁকি বেশি, তাদের ক্ষেত্রে একটু সচেতন হওয়া জরুরি। হঠাৎ করে কাউকে জোরে জড়িয়ে ধরা বা শরীর শূন্যে তুলে ফেলার মতো বিষয়গুলো পরিহার করা শ্রেয়।
তীব্র বুকব্যথা, শ্বাস নিতে কষ্ট বা কাশি ও নড়াচড়ার সময় ব্যথা তীব্র হলে বিষয়টিকে সাধারণ পেশির টান ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। পাঁজরের হাড় ভাঙলে অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এমন উপসর্গে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। চিকিৎসার পর তাঁকে অস্ত্রোপচার ছাড়াই বিশ্রাম ও ওষুধের মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
নিজের শরীরের সংকেত বোঝা এবং হাড়ের যত্ন নেওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। কেবল ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট বা ওষুধের ওপর নির্ভর না করে সুষম জীবনযাপন ও চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শই পারে অস্টিওপোরোসিসের মতো নীরব ঘাতক থেকে আমাদের রক্ষা করতে। ঘটনাটি ব্যতিক্রমী হলেও এটি মনে করিয়ে দেয়, শরীরের ভেতরে হাড়ের দুর্বলতা তৈরি হলেও অনেক সময় তা সহজে বোঝা যায় না।





















