ইসরাইল ও মার্কিন নির্বাচন: বিশ্ব রাজনীতির নতুন মোড়

ইসরাইলে মঙ্গলবার পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং এর মাত্র এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এই দুটি নির্বাচনের ফলাফল শুধু দেশ দুটির ভাগ্যই নির্ধারণ করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথও অনেকাংশে প্রভাবিত হবে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার টিপ ও’নিলের মতে সব রাজনীতিই স্থানীয় হলেও, বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনগুলো বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুই দেশের নির্বাচনের মধ্যে রয়েছে এক শক্তিশালী যোগসূত্র। রিপাবলিকানস ওভারসিজ ইসরাইলের তথ্যমতে, প্রায় পাঁচ লাখ ইসরাইলি নাগরিকের মার্কিন পাসপোর্ট থাকায় তারা উভয় দেশের নির্বাচনেই ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। সংগঠনটির চেয়ারম্যান মার্ক জেল জানান, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনী দৌড়ে এই ভোটাররা निर्णायक ভূমিকা পালন করতে পারেন। তবে এবারের ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন কেবল দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের অভ্যন্তরীণ জটিল পরিস্থিতি ছাড়া অন্য বিষয়গুলোতে নিজের উদ্যোগ ও সক্ষমতা দেখাতে চাইবেন।’।
আরও পড়ুন: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন ৩ নভেম্বর: ট্রাম্পের প্রশাসনিক ক্ষমতার বড় পরীক্ষা
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কৌশলগত অবস্থান ও যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলের বিমান হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও নেতৃত্বের বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি করেছে। ট্রাম্প এরই মধ্যে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইরান ইস্যুতে আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, দুই নেতারই উচিত ইরানে দ্রুত কাজ শেষ করা।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপ সরে গেলে ট্রাম্প ইরানে আরও বড় সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যদিও এই কৌশল অতীতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে, তবুও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী মহলে এর সমর্থন রয়েছে। তবে অনেক কূটনীতিক মনে করেন, নির্বাচনের পর ট্রাম্প তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সুসংহত করার লক্ষ্যে নতুন কোনো সাহসী পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হতে পারেন। তবে অন্যরা একে অবাস্তব প্রত্যাশা বলে মনে করছেন। তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা যে ওয়াশিংটনের নির্বাচনী জনমত জরিপের দিকে নিবিড় নজর রাখছেন, তা অস্বাভাবিক নয়।
আরও পড়ুন: মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনসমর্থন ৩২ শতাংশে পৌঁছেছে
ইসরাইলি রাজনীতির ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা আছে। সেখানে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে ইরানের ওপর নতুন হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা কমে যেতে পারে। ট্রাম্প নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইসরাইলে ভুল নেতৃত্ব থাকলে আমেরিকাকেই সরাসরি দায় নিতে হবে, যা তিনি করতে আগ্রহী নন।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে হামলা চালানো হলে তা কেবল সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করবে না, বরং আঞ্চলিক শান্তি ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। ইরান হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি অবকাঠামো ও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত রেখেছে। ইরানি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ও ব্যক্তিগত আলোচনায় বিমানবন্দর, পাইপলাইন, সমুদ্রের তলদেশের যোগাযোগ কেবল, জ্বালানি স্থাপনা, লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র, মার্কিন ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছেন।
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এই অস্থিরতার প্রভাব সুস্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান সংকটের ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে ইসরাইলেও, যেখানে প্রতিরক্ষা খাতের অতিরিক্ত ব্যয় ও মজুরি সংকট নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশটির সরকারি অর্থের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কের বিষয়টিও নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে। ট্রাম্প গত সপ্তাহে নেতানিয়াহুকে ‘মহান যোদ্ধা’ বলে প্রশংসা করলেও, এর আগে তাকে ‘ভীষণ পাগল’ বলেও সম্বোধন করেছিলেন। নির্বাচনে নেতানিয়াহু হেরে গেলে দুই নেতার সম্পর্কে বড় ধরনের ছেদ পড়তে পারে।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের আধিপত্য বাড়লে ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থনে কিছুটা রাশ টানা হতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা ও ভেটো প্রদানের অধিকার বজায় থাকায় যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পুরোপুরি শেষ হবে না।
চলতি বছরের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানবিরোধী নীতি বিশ্ব ভূরাজনীতিতে যে বড় পরিবর্তন এনেছে, এই নির্বাচনের পর তার পরবর্তী ধাপ নির্ধারিত হবে। বিশ্বের দৃষ্টি এখন এই ভোটারদের সিদ্ধান্তের দিকে, কারণ এটিই ঠিক করবে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব কোন পথে এগোবে।

















