বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে রেকর্ড গড়া ‘তাপঝড়’

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের ধরণ ও স্থায়িত্বে বিপজ্জনক পরিবর্তন এসেছে। অতীতে স্বল্প সময়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে সীমিত থাকা তাপপ্রবাহগুলো এখন দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়ে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীর বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়াকে ‘তাপঝড়’ বা ‘হিট স্টোর্ম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বেজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব বাড়ছে। এমন ভয়ংকর তাপপ্রবাহকে ‘তাপঝড়’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশক থেকে চলতি দশক পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে তাপঝড়ের উপস্থিতি বহুগুণ বেড়েছে। ছয় দশকের তাপমাত্রা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৬০-এর দশকে বছরে গড় তাপঝড়ের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচটি, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০২টিতে। বিশ্বজুড়ে ১০ লাখেরও বেশি ভৌগোলিক এলাকার ১৯৬০ সাল থেকে প্রতিদিনের তাপমাত্রার উপাত্ত পরীক্ষা করে এবং প্রায় দুই ডজন জলবায়ু গবেষক ও আবহাওয়াবিদের মতামত নিয়ে এ পরিবর্তনের কথা জানানো হয়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রয়টার্সের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬০-এর দশকে বছরে গড়ে প্রায় পাঁচটি তাপঝড় সক্রিয় থাকত। এ কাজে দুই ডজন আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু গবেষকের মতামতও নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: মাত্র সাত বছরেই ৪৯ কবিতার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করল ক্ষুদে
আবহাওয়ার মানদণ্ড অনুসারে, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় টানা পাঁচ দিন বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে অস্বাভাবিক মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বিরাজ করলে তাকে তাপপ্রবাহ বলা হয়। আর এই অস্বাভাবিক অবস্থা যখন বৈশ্বিক মোট আয়তনের অন্তত এক শতাংশ বা তার বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তার লাভ করে, তখন তাকে ‘তাপঝড়’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৬০-এর দশকের সর্ববৃহৎ তাপপ্রবাহটি লাতিন আমেরিকার কিছু অংশ, পশ্চিম আফ্রিকা ও আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর প্রায় ৪৬ দিন স্থায়ী হয়েছিল, যা পৃথিবীর মোট এলাকার প্রায় ছয় শতাংশকে আক্রান্ত করে। এর বিপরীতে চলতি দশকের সবচেয়ে দীর্ঘতম তাপঝড়টি প্রায় ৩৬৭ দিন স্থায়ী হয়ে পৃথিবীর অন্তত ৮৫ শতাংশ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া একটি নজিরবিহীন তাপঝড় বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ ভূখণ্ডকে প্রভাবিত করেছে।
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘাস কাটা নিয়ে সংঘর্ষে আহত ৩০, এলাকায় উত্তেজনা
সাম্প্রতিক সময়ের তীব্র তাপপ্রবাহগুলোর প্রভাব কেবল অতিরিক্ত গরমে সীমাবদ্ধ নেই; এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র খরা, দাবানল, কৃষিক্ষেত্রে বিপর্যয় এবং বিপুল প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তাপঝড়ের সময় সৌদি আরবের মক্কায় হজের মৌসুমে তাপমাত্রা ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলে এক হাজার ৩০০ জনের বেশি হজযাত্রী মারা যান। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় মারাত্মক খরা ও দাবানল সৃষ্টি হয়। এছাড়া ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও প্রবল বর্ষণের জেরে লিবিয়ার দেরনা শহরে বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। তাপঝড়ের প্রভাব শুধু অসহনীয় গরমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি খরা ও দাবানল বাড়াতে পারে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে এবং প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ায়।
পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের জুন ও জুলাই মাসে তীব্র তাপদাহের কারণে ইউরোপের বিশাল অংশে রেললাইনের ইস্পাত বেঁকে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। ইউরোপের কয়েকটি দেশের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কেবল এক সপ্তাহের ব্যবধানে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত ১০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। একই বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ‘রাইমুন্ডো’ নামের একটি তাপপ্রবাহ বিশ্বের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকায় বিস্তৃত হয়, যা ইউরোপ জুড়ে দাবদাহ সৃষ্টি করার পাশাপাশি স্পেন ও ফ্রান্সে বিধ্বংসী দাবানলের জন্ম দেয়।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে যে, ১৯৬০-এর দশকের পর থেকে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর ফলে তাপপ্রবাহ ও তাপঝড়ে আক্রান্ত বৈশ্বিক এলাকার গড় পরিধি ১২ গুণেরও বেশি বেড়েছে। এর পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগরের পর্যায়ক্রমিক উষ্ণ অবস্থা অর্থাৎ ‘এল নিনো’ প্রক্রিয়া তাপপ্রবাহের মাত্রাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
নিউজিল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলিংটনের অধ্যাপক জেমস রেনউইক সতর্ক করে বলেছেন, তাপঝড় বিশ্ব সভ্যতার জন্য এক মারাত্মক হুমকি। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাণহানির পেছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হলো এই অতিরিক্ত তাপমাত্রা, যা সামনে খাদ্যসংকট, দুর্ভিক্ষ, সম্পদের দখল নিয়ে সংঘাত এবং ব্যাপক প্রাণহানি বাড়াতে পারে। বৈশ্বিক তাপমাত্রার লক্ষ্যমাত্রার জটিল আলোচনার চেয়ে বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই তাপঝড়গুলো মূলত সাধারণ মানুষের দৈনিক জীবনে জলবায়ু সংকটের সরাসরি আঘাতকে সামনে নিয়ে এসেছে।














