সকল ধর্মের মানুষকে নিয়ে দেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রী তারেক

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে তিন জেলার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকা থেকে সামরিক বিমানে প্রথমে রংপুর, পরে রাজশাহী ও শেষে চট্টগ্রাম জেলায় যান প্রধানমন্ত্রী। এসব জেলা সফরে বেশ কয়েকটি পথসভা ও জনসভায় বক্তব্য দেন তিনি। এ ছাড়া পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি। এসব অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রে সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে একসঙ্গে দেশ গড়ার বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সতর্ক করে বলেন, গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে- সীমান্তের ওপার থেকে একটি পক্ষ এবং দেশের ভেতরে আরেকটি পক্ষ অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
রংপুর ও সৈয়দপুর সফর
মঙ্গলবার সকাল ৯টায় রাজধানী তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে একটি সামরিক বিমানে রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে তিনি সৈয়দপুর পৌঁছান। বেলা ১২টা ৪ মিনিটে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে মন্দির প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রী পৌঁছালে তাকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। ছোট শিশুরা প্রধান অতিথিকে নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানায়। সৈয়দপুর থেকে রংপুর যাওয়ার পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরে দু’টি পথসভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি রংপুরে বৈষম্যহীন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। রংপুর মহানগরের উন্নয়নের জন্য গত দুই সপ্তাহ আগে একনেক মিটিংয়ে ১৮শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এরপর সার্কিট হাউজে মধ্যাহ্নভোজ সেরে রওনা হন চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। সৈয়দপুর থেকে রংপুর আসার পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীর পথসভা: প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই ১২ তারিখের নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের মানুষ বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার দিয়েছে।
আরও পড়ুন: কাতারে ফরাসি প্রেসিডেন্টের প্রথম সফর: লুসাইল প্রাসাদে রাজকীয় অভ্যর্থনা
রাজশাহীতে আখ চাষিদের প্রণোদনা
দুপুর ২টা ২০ মিনিটে নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে একটি সামরিক বিমানে রওনা দিয়ে ২টা ৫৫ মিনিটে রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি সরাসরি হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে যান। এই জনসভায় তিনি রাজশাহী অঞ্চলের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখ চাষির মধ্যে ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা বিতরণ করেন। কম্পিউটারে বোতাম টিপে এই অর্থ চাষিদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে প্রদান করেন তিনি। এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে ১৫ জন আখ চাষিকে সরাসরি চেক প্রদান করা হয়। জনসভায় বিএনপি’র প্রতি জনগণের সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা ও তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ, কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো, কৃষক কার্ড চালু এবং নারীদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেয়ার মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণের সমর্থন প্রয়োজন। সেজন্যই আপনারা দেখেছেন যে কৃষকদের কৃষি ঋণ আমরা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মওকুফ করেছি সঙ্গে সঙ্গে। তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারেজ নির্মিত হলে রাজশাহীসহ আশপাশের প্রায় ১৪টি জেলার মানুষ উপকৃত হবেন।
আরও পড়ুন: মাত্র সাত বছরেই ৪৯ কবিতার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করল ক্ষুদে
মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের চেতনা
রংপুরের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে আমরা যখন যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, তখন কোনো ধর্ম দেখিনি।
প্রত্যেকটি মানুষ বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন মতের, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুদ্ধের ময়দানে প্রাণ দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল। ঠিক একইভাবে দেশ স্বাধীনের পরে যখন বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল, তখন এই দেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাজপথে নেমে এসেছিল। যে মানুষগুলো সেদিন নেমে এসেছিল, সেই মানুষগুলোর ভেতরেও সকল ধর্মের, সকল মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিল। তিনি আরও বলেন, আমরা যেমন সকলে মিলে দেশ স্বাধীন করেছিলাম এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, ঠিক একইভাবে বর্তমান সরকারকে এই দেশের মানুষ নির্বাচিত করেছে। সরকার এমন একটি অবস্থানে থাকতে চায় যে, যারা ভোট দিয়েছেন এবং যারা দেননি—সবাই যেন এই সরকারের ছায়াতলে সমান নিরাপত্তা পান। ঠিক একইভাবে বেশিদিন আগের কথা নয়, দুই আড়াই বছর আগের কথা- বাংলাদেশে একটি গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা যদি সেই গণ-অভ্যুত্থানের রাজপথের দৃশ্য দেখি, তাহলে দেখবো- সেই দৃশ্যের মধ্যে এই বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল ধর্মের মানুষের সম্মেলন সেখানে হয়েছিল। তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে একটি কথা বলতে হয়। আসুন আপনাদের যদি কিছু বলার থাকে, জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদ গঠন করেছে- সেই সংসদে জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের পাঠিয়েছে। আমরা ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ অন্য ধর্মের যারা ধর্মীয় গুরু আছেন তাদের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা আমরা করেছি। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের উদ্যোগ নেয়ার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, যারা পানির সমস্যা তৈরি করেছে, তাদের সঙ্গে সরকার কথা বলবে।
গণ-অভ্যুত্থান ও বিভ্রান্তি দূরীকরণ
বর্তমান সরকার সকলকে নিয়ে চলার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু মহল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। ’২৪-এর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানকেও বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চলছে। তিনি দেশবাসীকে সতর্ক করে বলেন, দয়া করে আপনারা কেউ ’২৪-এর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করবেন না। দেশটি আমাদের সকলের। অতীতে আমরা যে রাজনীতি দেখেছি তার পরিবর্তন করতে সরকার কাজ করছে। এই পরিবর্তনে জনগণের ঐক্য সবচেয়ে বড় শক্তি। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পরিচালনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপি’র সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ রংপুরের সংসদ সদস্য ও জেলা নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, দেশের অগ্রগতির স্বার্থে, কৃষক ভাইদের অগ্রগতির স্বার্থে, মানুষের অগ্রগতির স্বার্থে আমরা দেখেছি, কীভাবে আমাদের পদ্মা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, কীভাবে এই নদীর পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ও শেষ সফর
রাজশাহী থেকে একই বিমানে চট্টগ্রাম পৌঁছে শহরের একটি পূজামণ্ডপে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। জেএম সেন হল ও রহমতগঞ্জ পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন তিনি। এছাড়া চট্টগ্রামেও জনসভায় বক্তব্য রাখেন এবং সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। সরকারপ্রধান জানান, সকল বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে এসে দেশ গড়ার কাজে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ যাতে তাদের প্রত্যাশিত জীবন পায়, তা নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সহাবস্থানই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সকল এলাকার উন্নয়ন আমরা সমানভাবে রাষ্ট্রের যে অর্থনৈতিক অবস্থা আছে তার ওপরে বিবেচনা করে আমরা সকল এলাকার সমবণ্টন করে সকল এলাকার সমানভাবে উন্নয়ন করতে চাই। শুধু তাই নয় লোকাল গভর্মেন্টের মাধ্যমে জেলা পরিষদকে দিয়ে আমরা এই জেলার বিভিন্ন উপজেলাগুলোতে বিভিন্ন ইউনিয়নগুলোতে, বিভিন্ন গ্রামগুলোতে মানুষের প্রয়োজনীয় যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার দরকার, ব্রিজ-কালভার্ট দরকার, স্কুল কলেজ দরকার সেগুলো ইনশাআল্লাহ আমরা পর্যায়ভাবে গড়ে। বাংলাদেশের মানুষ সেই ফলাফলটিকে বা সেই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যটিকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। আমরা অতীতের মতো এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে না করি যাতে করে জনগণের যে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আছে জনগণের যে সন্তানদের যে শিক্ষা আছে, স্বাস্থ্য সুবিধা আছে, জনগণের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি বাকরি আছে, এগুলো যাতে কোনোভাবে ব্যাঘাত না ঘটে এ দেশে।






















