নাব্যতা ও শিল্পবর্জ্যের দূষণে মৃতপ্রায় হবিগঞ্জের সুতাং নদী

নাব্যতা সংকট এবং শিল্পকারখানার অপরিকল্পিত বর্জ্য নিঃসরণের ফলে হবিগঞ্জের সুতাং নদী এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। একসময়ের প্রবহমান এই নদীটি বর্তমানে বিষাক্ত কালো পানিতে পূর্ণ মরা খালে পরিণত হয়েছে। ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন হয়ে ৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৩৬ মিটার গড় প্রস্থের এই নদীটি চুনারুঘাট হয়ে কিশোরগঞ্জের মেঘনা শাখা কালনী নদীতে মিশেছে। তবে বর্তমানে দূষণ ও পলি জমে এর স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জানা গেছে, একসময়কার সমৃদ্ধ জলপথ হবিগঞ্জের সুতাং নদী এখন তীব্র পরিবেশগত সংকটের কবলে পড়েছে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপত্তি লাভ করে এটি হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুতাং বাজারের ওপর দিয়ে লাখাই উপজেলার মাদনা এলাকা হয়ে কিশোরগঞ্জে মেঘনার শাখা কালনী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। শিল্পদূষণের পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল ও অতি বর্ষণের ফলে ভারত থেকে আসা উজানের পানি ও পলিমাটিতে ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়েছে নদীটি। ফলে নদীর তীরবর্তী শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুরাবই, আলগাপুর, শৈলজুড়া, সদর উপজেলার সাধুরবাজার, ভঙ্গুরহাটি, রাজিউড়া, ফান্দ্রাইল, সানাবই, উচাইল, বেকিটেকা, নাজিরপুর, লুকড়া, লাখাই উপজেলার করাব, বুল্লা, বেগুনাই, বরগান্দিসহ বেশকটি গ্রামে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সুতাং নদীর পানি দূষণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রয়েছে প্রাণ (আরএফএল) ও স্কয়ার কোম্পানির একাধিক প্রতিষ্ঠানের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার অলিপুর এলাকায় গড়ে ওঠা অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নেই কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি। আবার যেসব কারখানায় ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও পরিচালন খরচের ভয়ে অনেক সময় বন্ধ রাখা হয়। ফলে কারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্য সরাসরি ছোট-বড় পাইপলাইনের মাধ্যমে শৈলজুড়া খালে পড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত সুতাং নদীর পানিকে দূষিত করছে। তারা অলিপুর এলাকায় বিশাল আয়তন নিয়ে একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে।
আরও পড়ুন: মার্কিন সিনেটর: ট্রাম্প-রুবিওর নীরবতা ইসরাইলকে বেপরোয়া করছে
পরিবেশের এই বিপর্যয় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
নদীর তীরবর্তী শায়স্তাগঞ্জ, সদর ও লাখাই উপজেলার সুরাবই, শৈলজুড়া, রাজিউড়া, করাব ও বুল্লাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ কৃষি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছেন।
আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালিতে ইন্টারনেট ক্যাবল নিয়ে ইরানের হুমকি, কাতারের উদ্বেগ
স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, আগে এই নদীর পানি ব্যবহার করে প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হতো। এখন দূষিত পানির কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাধ্য হয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কয়েক হাজার জেলে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো কোম্পানিগুলো পরিচালিত হচ্ছে। অথচ শিল্পকারখানাতে ইটিপি ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এতে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে অনাবাদি থেকে যাচ্ছে অনেক জমি, যা সামগ্রিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এজন্য খরচ দ্বিগুণের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ধান চাষ করে আর লাভবান হওয়া যাচ্ছে না।
কৃষক ছালেক মিয়া ও জাহাঙ্গীর আলমের মতে, আগে বন্যার পানি জমির উর্বরতা বাড়ালেও এখন দূষিত পানি জমি ও ফসল উভয়ই নষ্ট করছে। নদীর পানি ব্যবহারের ফলে চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন এলাকাবাসী। এছাড়া গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। এমনকি নদীর পানি ধানের জমিতে দিলে চারা গাছ মরে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন সাধুর বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। চর্মরোগসহ বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা নদীটির পানি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করে ভয়াবহ তথ্য পেয়েছেন। জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক ইফতেখার আহমেদ ফাগুন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. শাকির আহম্মেদ নিশ্চিত করেছেন যে, সংগৃহীত নমুনাগুলোতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শিল্পদূষণে পানির ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হওয়ায় নদীর নিম্নপ্রবাহে মাছের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, বিশেষ করে শৈলজোড়া খালের সংযোগস্থলে কোনো জলজ প্রাণীই টিকে থাকতে পারছে না। নদীটির চিহ্ন মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে শিল্পবর্জ্যের দূষণে পানি বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা এর প্রতিবাদ করে কোনো সুফল পাননি।
খোয়াই রিভার ওয়াটার কিপারের তোফাজ্জল সোহেলের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সুতাং নদী অচিরেই কেবল স্মৃতিতে পরিণত হবে। তিনি নদী রক্ষায় কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সরকারি মহলের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি নজরে রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. ইউসূফ আলী জানিয়েছেন, সিলেট অফিস বিষয়টি নিয়মিত মনিটরিং করছে এবং নমুনা সংগ্রহ করে তদন্ত চালানো হচ্ছে। জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ জানিয়েছেন, বিষয়টি প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে রয়েছে। এছাড়া জাতীয় সংসদের হুইপ ও সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটির সভাপতি জিকে গউছের নির্দেশে সম্প্রতি একটি বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিনে তদন্ত করেছে। দ্রুতই তাদের প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আর যাদের এসব দেখভাল করার কথা, সেই পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন যেন কিছুই দেখছেন না। মনে হয় কোম্পানিগুলোর এসব অনিয়ম দেখার যেন কেউ নেই। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের নজরদারির অভাবে বহমান এ নদীটি কালের আবর্তে বিলীন হতে চলেছে।






















