ইশরাক ইস্যুতে মিডিয়া ট্রায়াল ও রাজনৈতিক সমীকরণ

সম্প্রতি ইশরাক হোসেনকে কেন্দ্র করে যে মিডিয়া ট্রায়ালের ঘটনা ঘটেছে, তা গণমাধ্যমের বিতর্কিত ভূমিকার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। ঐতিহাসিকভাবে ইরাক ও আফগান যুদ্ধের আগে পশ্চিমা মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশনের ধরনে এমন পক্ষপাতিত্ব দেখা গিয়েছিল। বাংলাদেশে গত ১৫ বছর ধরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে যেভাবে চরিত্র হননের মিশন চলেছে, ইশরাক ইস্যুতেও সেই একই ফ্রেমিং লক্ষ্য করা গেছে। গণমাধ্যম প্রকৃত ইস্যু আড়াল করে ব্যক্তি চরিত্র হননে বেশি তৎপর হয়ে উঠেছে। গণমাধ্যম যে মাঝে মাঝে বিতর্কিত ভূমিকায় উপনীত হয় এটা আমরা ইরাক ও আফগান যুদ্ধের পূর্বে আমেরিকার বিভিন্ন মিডিয়ার সংবাদ প্রকাশের ধরন দেখে হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছি। বাংলাদেশে তো সাংবাদিকতার নামে একদল লোকের চরিত্র নির্মাণ ও আরেক দল লোকের চরিত্র নাশের এক নগ্ন খেলায় পরিণত হতে আমরা এর আগে বহু দেখেছি। আজকে যিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, জনাব তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে মিডিয়াগুলোর চরিত্রনাশা মিশন আমরা বিগত ১৫ বছর ভালো মতোই দেখেছি। বিধি মোতাবেক তা বে-আইনি এটা বলার সুযোগ নাই। পুলিশ কেন এখনো যথেষ্ট সক্রিয় হতে পারছে না। বাংলাদেশের গণতন্ত্রবিরোধী মিডিয়াগুলো এই ইস্যুতে তাদের চরিত্র ভালোই উদাম করে দিয়েছে। আমরা দেখলাম মিডিয়া একের পর এক খবর ছাপিয়ে যাচ্ছে এমন ভাবে যার সঙ্গে আসল ঘটনার কোনো সংযোগ নেই। এই ঘটনায় বিরল ব্যতিক্রমবাদে পত্রিকা ও অন্য মিডিয়াগুলো যে পপুলার বয়ান তৈরি করতে চেষ্টা করলো, যেভাবে পারসেপশন তৈরি করলো তাতে কতোগুলো বিষয় সামনে আসে।
আরও পড়ুন: নতুন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের ঘোষণা দেবে কাতার
মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ইশরাক পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাজ করছিলেন। অতীতে এই এলাকায় মাদক সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর গুলি চালিয়েছিল, যার ফলে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস করত না। আত্মরক্ষার জন্য নিজের লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র সাথে রাখা সত্ত্বেও মিডিয়া এটাকে নেতিবাচকভাবে প্রচার করেছে। মাত্র কয়েক মিনিটের একটি দৃশ্যকে বড় করে দেখিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে জনগুরুত্বপূর্ণ অভিযানকে আড়াল করা হয়েছে। মার্শাল ম্যাকলোহানের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘মিডিয়া ইজ দ্যা মেসেজ’ এবার যেন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আবারও প্রমাণিত হলো। হারিয়ে গেল মাদকের বিরুদ্ধে তার অভিযানে নামার জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি। মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশ ও নতুন প্রজন্মকে কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব- এই সকল আলোচনার বদলে মিডিয়াতে সয়লাব হয়ে গেল অস্ত্র হাতে ইশরাক। মিডিয়া পণ্ডিত মার্শাল ম্যাকলোহান একটা কথা বলেছিলেন: মিডিয়া ইজ দ্যা মেসেজ।
ইশরাক হোসেনকে নিয়ে যখন পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ে, তখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ইশরাক নিজে একে গুজব বলে উড়িয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে বিটিভি যখন খবর প্রচার করে যে প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন, তখন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে তা ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করে সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ইশরাক এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, তিনি দলের বা প্রধানমন্ত্রীর চাপে নয়, বরং নিজেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার লক্ষ্য হলো, পপুলার সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলোকে যেন বিতর্কিত বা আড়াল করা না হয়। পরদিন দুপুরে নিজেই সংবাদ সম্মেলন করে জানান, প্রধানমন্ত্রীকে তিনি নিজেই পদত্যাগ করতে চান বলে জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের সব শিশুকে স্পেসএক্সের শেয়ার দেবেন ইলন মাস্ক
এই পুরো ঘটনায় ইশরাকের কর্মকাণ্ডের ইনটেনশন বা উদ্দেশ্যকে পুরোপুরি এড়িয়ে কেবল অ্যাকশন বা দৃশ্যপটকে সামনে আনা হয়েছে। উমবার্তো একোর ভাষায়, আধুনিক সেন্সরশিপ এখন খবর গোপন করার চেয়ে ইস্যুকে নন-ইস্যু বানানো বা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়কে মূল ফোকাসে নিয়ে আসার মাধ্যমে কার্যকর হয়। মাদক সিন্ডিকেট ও তাদের মদদদাতারা কি মিডিয়ার এই ফ্রেমিং থেকে সুবিধা পাচ্ছে? ইশরাক নিজেই আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটের যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সরকার যদি সুশীল সমাজের বয়ানে প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা মাদক সম্রাটদের মনোবল বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে সরকারের অফিসিয়াল সিদ্ধান্ত আসার আগে পদত্যাগের বিষয়ে যে খবর চাউর হয় তা সারাদিনের মিস-ফ্রেমিং এর বাই প্রোডাক্ট।
বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার জন্য এই ধরনের হাইপ তৈরির পেছনে সরকারি দলের ভেতরের ও বাইরের শক্তির যোগসাজশ রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। দলকে রাজনৈতিকভাবে বলি দিয়ে সরকারের স্থায়িত্ব বাড়ানো বা জনপ্রিয়তা অর্জন করা আত্মঘাতী কৌশল হতে পারে। জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে এবং বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করতে বরং এই ধরনের মিডিয়া ট্রায়ালের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ইশরাক হোসেন যেন এক নতুন রাজনৈতিক যাত্রার ইঙ্গিত দিয়েছেন। মন্ত্রী বা সরকারি পদের চেয়ে জননেতা হিসেবে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারই এখন তার মূল লক্ষ্য। সাহসিকতার জন্য নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন, এবার নতুন পরিচয়ে পুনর্জন্ম হচ্ছে তার। আদালতের বিচারে অপরাধের ক্ষেত্রে যেমন ইনটেনশন দেখা হয়, মিডিয়া ট্রায়ালের ক্ষেত্রে তার তোয়াক্কা করা হয়নি। তবে মাঠের লড়াই ও মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়াই এখন ইশরাকের প্রধান চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই দৃশ্যটা অনেকের পছন্দ হয়নি।


















