উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও জ্ঞানচর্চার রূপান্তর

ঔপনিবেশিক শাসন-শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসা দেশগুলোর সামনে বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির পথ সুগম করতে মাতৃভাষায় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। ইতিহাস ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায়, বিদ্যাসাগর একাধিক ভাষায় সুপণ্ডিত হয়েও মাতৃভাষা বাংলার চর্চার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তিনি সংস্কৃত ও ইংরেজি চিরায়ত সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করে মাতৃভাষার ভিত্তি মজবুত করার প্রয়াস চালিয়েছিলেন। নগুগি ওয়া থিয়ঙ্গো-এর মতে, মাতৃভাষার পরিবর্তে অন্য ভাষায় পারদর্শী হওয়া দাসত্বের নামান্তর। তাঁর মতে, “আপনি যদি নিজের মাতৃভাষা ছাড়া জগতের অন্য সকল ভাষাও রপ্ত করে থাকেন, তাহলে আপনি দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি রয়েছেন। কিন্তু মাতৃভাষা রপ্ত থাকার পাশাপাশি অন্যান্য ভাষার শক্তি যুক্ত করতে পারলে প্রকৃত ক্ষমতায়ন ঘটে।” এই সত্যটি উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর জন্য গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক (তথ্যসূত্র: Ngugi wa thiong’o, ‘Makers Dream’, Dcolonizing Language and Other Revolutuinary Ideas, পৃষ্ঠা ৭৩)। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩৫। অন্যদিকে, মাতৃভাষা যদি আপনার রপ্ত থাকে, আর তার সঙ্গে যদি জগতের অন্যান্য ভাষার শক্তি যুক্ত করেন, তাহলে আপনার ক্ষমতায়ন ঘটেছে।”২৯১। তথাপি, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আপন ‘জাতিভাষা’ অর্থাৎ মাতৃভাষা বাংলা চর্চার বিশেষ গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বরাবরই সচেতন ছিলেন। কিন্তু এখানে এটাও উপলব্ধি করা জরুরি যে, ঔপনিবেশিক ভাষার বদলে নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষাপ্রদানের ক্ষেত্রে, পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ আপন আপন দেশে নিজ নিজ ভাষায় শিক্ষাদানের মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় ইতিমধ্যেই যে প্রভূত অগ্রগতি সাধন করেছে, উপনিবেশোত্তর।
আরও পড়ুন: এফডিআই বাড়লেও নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা, মুনাফা পুনর্বিনিয়োগই ভরসা
তৃতীয়ত, উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতন্ত্রায়ণের জন্য জনশিক্ষার প্রসার একান্ত জরুরি। বৈশ্বিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাক্তন উপনিবেশক শক্তিগুলোসহ উন্নত দেশগুলো মাতৃভাষায় জনশিক্ষা নিশ্চিত করেই জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষ সাধন করেছে। তাই উন্নয়নকামী দেশগুলোকে এই মডেল অনুসরণের মাধ্যমেই বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে হবে। তবে মাতৃভাষায় শিক্ষার অর্থ এই নয় যে, বিশ্বজ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। পশ্চিমা দেশগুলো তাদের নিজেদের ভাষায় যে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করছে, তা আমাদের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনে বিদেশি ভাষা শেখাও একটি অপরিহার্য দায়িত্ব।
নানা বিদেশি ভাষায় থাকা উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞান দেশীয় ভাষায় নিয়ে আসার প্রধান মাধ্যম হলো অনুবাদ। উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের উচিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক বৃহৎ অনুবাদ প্রকল্প গ্রহণ করা। প্রথিতযশা অধ্যাপকদের নেতৃত্বে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ বিউপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে এবং গণতান্ত্রিক মুক্তির পথ প্রশস্ত করবে। এটি কেবল একটি ভাষাগত পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, যথাযথ অনুবাদ ও মাতৃভাষার চর্চাই আধুনিক জ্ঞান-ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের একমাত্র কার্যকর পথ হতে পারে। এই প্রশ্নের সর্বজনীন উত্তর হলো, অনুবাদ — প্রচুর অনুবাদ।






















