রপ্তানি পণ্যের নতুন সম্ভাবনা: তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জাম শিল্প

প্রচলিত তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জাম তৈরির শিল্প একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বাজারে ক্যাম্পিং ও অ্যাডভেঞ্চার সরঞ্জামের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এ শিল্পের বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে তাঁবু রপ্তানির ক্ষেত্রে চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এই খাতে ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোও বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুসংহত করেছে। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি নতুন উৎপাদন ইউনিট স্থাপন এবং বিদ্যমান কারখানাগুলোর সক্ষমতা সম্প্রসারণ হলে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। ইপিবির তথ্যানুযায়ী এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাতটিতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহও বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশে আরো বিনিয়োগ বাড়াতে চান তারা। তাঁবুর অ্যাকসেসরিজ, সেফটি শু ও ফ্যাশন শু উৎপাদন করে বাংলাদেশের শিল্পায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আরো উন্নত পণ্য, টেকসই উপকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ক্যাম্পিং সরঞ্জাম তৈরির সক্ষমতা অর্জন করা গেলে স্থানীয় উৎপাদকরা উচ্চমূল্যের অর্ডার পাওয়ার প্রতিযোগিতায় আরো ভালো অবস্থানে যেতে পারবেন। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা যখন আরো কঠিন হয়ে উঠবে, তখন প্রচলিত পোশাকের বাইরে প্রযুক্তিনির্ভর টেক্সটাইল পণ্যের এই ধরনের বহুমুখীকরণ বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের বাণিজ্য পরিসংখ্যান সংস্থা কমট্রেড এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, বৈশ্বিক বাজারে ক্যাম্পিং তাঁবুর বাজার বর্তমানে প্রায় ৬.১৮ বিলিয়ন ডলারের। ইপিবির সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ তাঁবু ও ক্যাম্পিং সামগ্রী রপ্তানি করে প্রায় ২৩৭.৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে এই খাত থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২০.৮৩ মিলিয়ন ডলার। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি করা তাঁবুর প্রায় ৯৩ শতাংশই সিনথেটিক ফাইবার থেকে তৈরি, যার আর্থিক মূল্য ২২ কোটি ৭ লাখ ডলার। বাকি অংশ ক্যাম্পিং সরঞ্জাম, তারপলিন ও ছাউনি এবং টেক্সটাইল ভিত্তিক তাঁবু থেকে আসে। পার্ক বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানান, কারখানায় উৎপাদিত ব্যাগের প্রায় ৮০ শতাংশই নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি করা হয়।
এই খাতের রপ্তানি আয়ের ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৪২১ মিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছিল ২৭৬ মিলিয়ন ডলারে এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ২২২ মিলিয়ন ডলার। করোনা মহামারির প্রভাবে বিশ্ববাজারে চাহিদা কিছুটা সংকুচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে খাতটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের ৪৯টি দেশে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সরঞ্জাম রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে গত অর্থবছরে ৮৭.৫২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৩৬.৯ শতাংশ। এরপর উল্লেখযোগ্য বাজারের তালিকায় রয়েছে ফ্রান্স (২৮.৭৩ মিলিয়ন ডলার), কানাডা (১৯.৯৯ মিলিয়ন ডলার), স্পেন (১৯.১৭ মিলিয়ন ডলার) এবং যুক্তরাজ্য (১৮.৪৪ মিলিয়ন ডলার)। এই পরিবর্তিত বাজার পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তৈরি পোশাকের পাশাপাশি নতুন নতুন পণ্য রপ্তানিতে দেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন: ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে সবাই বাংলাদেশি: এলজিআরডি মন্ত্রী
দেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে (ইপিজেড) এই শিল্পটি মূলত কেন্দ্রীভূত। বর্তমানে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীনে ১৪টি কারখানা সক্রিয়ভাবে উৎপাদন চালাচ্ছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। গত ২০ মে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘সানশাইন আউটডোর বিডি কোং লিমিটেড’ তাঁবু ও ক্যাম্পিং পণ্য উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের লক্ষ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগের জন্য জমি ইজারা চুক্তি করেছে। এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘পিএইচ ক্রিয়েটিভ বিডি লিমিটেড’ একই অর্থনৈতিক অঞ্চলে তাঁবুর ফ্রেম, ফাইবারগ্লাস পোল, স্লিপিং ব্যাগ, ক্যাম্পিং চেয়ার ও আনুষঙ্গিক পণ্য উৎপাদনের জন্য ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগের চুক্তি সম্পন্ন করে। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও হংকংসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশকে এসব পণ্যের অন্যতম উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছেন। আউটডোর বিনোদন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সহায়তায় তাঁবুর ব্যবহার বাড়ায় এ পণ্যের বৈশ্বিক বাজারও বড় হচ্ছে। যেখানে বছরে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ পিস তাঁবু, ব্যাগ-ব্যাকপ্যাক, ক্যাম্পিং চেয়ার-ফার্নিচার, লাগেজ, স্লিপিং ব্যাগ ও গেজেবো উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। গত অর্থবছরে ৩ কোটি ৭২ লাখ ডলারের তাঁবু রপ্তানি করেছে এইচকেডি আউটডোর ইনোভেশনস লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী ইপিজেডে অফমা ক্যাম্প লিমিটেড ক্যাম্পিংয়ে ব্যবহৃত হ্যামক বা ঝুলন্ত বিছানা, স্লিপিং ব্যাগ, বালিশ, ঘোড়ার স্যাডল প্যাডসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে। ২০১০ সালে কর্ণফুলী ইপিজেডে যাত্রা শুরু করা ‘এ-টাইপ’ প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার কর্মী কাজ করছেন।
বিনিয়োগের তালিকায় আরও রয়েছে ক্যাম্পভ্যালি গ্লোবাল লিমিটেড, যারা প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারের নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। হংকং-চীনভিত্তিক গ্রিন পিউর হাউসওয়্যার কোম্পানি লিমিটেড গ্রিনহাউস ও হাইড্রোপনিকস টেন্ট উৎপাদনে প্রায় ৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
এছাড়া তাইওয়ানের ন্যাটওয়ে আউটডোর ৩ কোটি ৩ লাখ ডলার এবং কুইন্ডা আউটডোর ১ কোটি ২০ লাখ ডলারের কারখানা স্থাপনে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং সক্ষমতা বাড়াতে সম্প্রতি আরো সাড়ে ৩ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে।
আরও পড়ুন: জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে বড় সংকট এখনো বাকি: কাতার
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ইপিজেডে অবস্থিত ক্যাম্পভ্যালি গ্লোবাল লিমিটেড বছরে প্রায় ১২ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী হং উ লি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ তাদের বৈশ্বিক সম্প্রসারণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া এইচকেডি ইন্টারন্যাশনাল তাদের ১১টি উৎপাদন লাইনের মাধ্যমে মাসে প্রায় ৩ লাখ তাঁবু তৈরি করছে এবং বিশ্বের ৩৩টি দেশে তা সরবরাহ করছে।
অফমা ক্যাম্প লিমিটেড নামক আরেকটি প্রতিষ্ঠান গত অর্থবছরে ৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যাদের অন্যতম বড় ক্রেতা ফরাসি খুচরা বিক্রেতা ডিক্যাথেলন।
তবে সম্ভাবনার বিপরীতে এ শিল্পের বিকাশে কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যাম্পভ্যালির বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক কামার উল হক জানান, উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত কাঁচামালের মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়। বাকি ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কাঁচামাল, বিশেষ করে পলিয়েস্টার ও নাইলন ফেব্রিক, পিইউ ও সিলিকন কোটিং, পলিয়েস্টার মেশ, দড়ি ও ফ্রেমের মতো উপকরণগুলো চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তিনি আরও জানান, যদি এসব কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করা যায়, তবে উৎপাদন খরচ অনেকাংশে কমে আসবে এবং দ্রুত পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু উদ্যোক্তা দেশে কাঁচামাল উৎপাদনের উদ্যোগ নিচ্ছেন, যা ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে। তাঁবু তৈরিতে ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষায়িত ফেব্রিক, কাঠামোগত পোল, জিপার, ফিটিংসসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক উপকরণের বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক মনে করেন, ইপিজেডগুলো শুধু পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর না থেকে এই ধরনের বৈচিত্র্যময় শিল্প গড়ে তোলায় দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কাঁচামাল উৎপাদনে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জাম শিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে।


















