ঢাকা মেডিকেলে ডেঙ্গুর প্রকোপ, মেঝে ও বারান্দায় চলছে চিকিৎসা

রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চরম শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত বেড পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় রোগীদের ঠাঁই হচ্ছে হাসপাতালের বারান্দা, করিডোরের মেঝে কিংবা লিফটের সামনের সরু জায়গায়। এমনকি একটি স্ট্যান্ডে দু’জনের স্যালাইন ঝুলিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার মতো কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রোববার দুপুর ২টা নাগাদ সরেজমিনে দেখা যায়, পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ ৫০২, ৪০২ ও ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। এরপরও জায়গা সংকুলান না হওয়ায় প্রতিদিনই নতুন নতুন বেড বাড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। কেউবা লিফটের সামনে সামান্য জায়গায় বিছানা পেতে নিয়েছেন আশ্রয়। প্রাইভেটে ডাক্তার দেখিয়েছিলাম আমরা গরিব মানুষ, তাই ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে এসেছি।
আরও পড়ুন: নিরাপত্তা সহযোগিতা ও অপরাধ দমনে চুক্তিবদ্ধ কাতার ও মিসর
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে ৬৪ জন, ৪০২ নম্বর ওয়ার্ডে ৪০ জন এবং ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ৫২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে প্রকৃত রোগীর সংখ্যা আরও বেশি, যার বড় একটি অংশই এসেছে ঢাকার বাইরে থেকে। অনেক রোগীই কোনো বেড না পেয়ে ওয়ার্ডের বাইরে কিংবা সিঁড়ির সামনে শয্যা পেতে শুয়ে আছেন। মাগুরার বাসিন্দা খোকন মিয়া এমনই একজন রোগী, যার শরীরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছিল এবং প্লাটিলেট নেমে এসেছিল ২০ হাজারে। পায়খানার সঙ্গে রক্তক্ষরণের মতো জটিল উপসর্গ নিয়ে বৃহস্পতিবার হাসপাতালে ভর্তি হলেও তাকে দীর্ঘ চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। রাত ৩টার দিকে একটি বারান্দার শয্যা খালি হলে সেখানে ঠাঁই মেলে তার, গত চারদিন ধরে সেখানেই চলছে তার চিকিৎসা।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী: ধর্ম-বর্ণের বিভাজন নয়, সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ গড়তে চাই
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ ও কষ্টের চিত্রও প্রকট। মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা ইউসুফ সরদার তীব্র জ্বর ও মাথা ব্যথা নিয়ে ওয়ার্ডের বাইরে লিফটের সামনে কাতরাচ্ছিলেন। তার বোন হাজেরা খাতুন জানান, গত চার দিন ধরে তার ভাই প্রচণ্ড জ্বর, বমি ও পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাইভেট হাসপাতালের বদলে তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন। একই ধরনের ভোগান্তিতে রয়েছেন আরও অনেক রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। তার মেয়ে রাবেয়া আক্তার বলেন, প্রথমে স্থানীয় একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। হাজেরা খাতুন বলেন, আমার ভাইয়ের গত ৪ দিন ধরে জ্বর, বমি আর পাতলা পায়খানা। পাশেই তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন বড় বোন হাজেরা খাতুন ও মেয়ে নাঈমা ইসলাম।
হাসপাতালটির মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও রেজিস্ট্রার ডা. সাজ্জাদ মাহমুদ জানান, ঢাকার বাইরের রোগীদের মধ্যে জটিলতা বেশি দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর কারণে রক্ত থেকে জলীয় অংশ বেরিয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন ত্বকের নিচে, বুকের ভেতর বা পায়ে জমা হচ্ছে। চিকিৎসকরা ফ্লুইড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগীর এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, শুধু প্লাটিলেট কমলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই, অন্যান্য জটিলতা দূর হলে প্লাটিলেট নিজেই বাড়তে থাকে। তাই রোগীর অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসকরা এখন শুধু প্লাটিলেট নয়, বরং পুরো রক্ত দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন, যাতে রোগীর সার্বিক শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হয়। এটা হতে পারে ত্বকের নিচে অথবা বুকের মধ্যে অথবা পায়ে গিয়ে জমা হচ্ছে অথবা অন্য কোথাও গিয়ে জমা হচ্ছে। রক্তের জলীয় অংশ রক্ত থেকে সরে গেলে রোগীর রক্তচাপ কমে যায়, প্লাটিলেটও কমে কিন্তু তা নিয়ে আমরা তেমন কোনো চিন্তা করি না।
এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালের বারান্দা ও করিডোরে বেড বসিয়েও চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখা হয়েছে। রোগীদের সুস্থ করে তুলতে চিকিৎসক ও নার্সরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, কিন্তু ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপে অবকাঠামোগত সক্ষমতার চেয়ে চাহিদা অনেক বেশি হওয়ায় সংকট কাটছে না। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নতুন নতুন শয্যা বাড়ানোর কাজ অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগীরই অবস্থা জটিল হওয়ায় তাদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।






















