সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: আগাম তথ্য পায়নি কেন ঢাকা?

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি এখন কূটনৈতিক অঙ্গনে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সিতে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য প্রকাশ করা হয়। দণ্ডিতদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি (সিঁথি) আক্তার হিসেবে জানানো হয়। অথচ এত বড় একটি ঘটনার আগে ঢাকা বা জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন কোনো আগাম বার্তা পায়নি। এই দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অন্ধকারে ছিল, তা নিয়ে ব্যাপক জনমনে ও প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি কর্তৃপক্ষের মধ্যে টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে বাংলাদেশিরা দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: লেবাননের জ্বালানি সংকট সমাধানে কাতারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি
কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর জেদ্দায় বাংলাদেশ কন্স্যুলেটে সৌদি কর্তৃপক্ষ বন্দিদের একটি তালিকা পাঠিয়েছিল। সেই তালিকায় নজরুলের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ এবং সুইটির বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগের উল্লেখ ছিল। তবে তাদের কী সাজা হতে পারে বা মামলার বর্তমান অবস্থা কী, সে বিষয়ে কোনো তথ্য ওই তালিকায় ছিল না। অথচ তালিকায় নাম পাওয়ার পরও মিশনের পক্ষ থেকে মামলা অনুসরণে কেন তৎপরতা চালানো হয়নি, তা নিয়ে বড় ধরনের ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, তথ্য আদান-প্রদান ও কূটনৈতিক যোগাযোগে কিছুটা ঘাটতি ছিল এবং অভিযোগের ধরন বিশ্লেষণ করে আগে পদক্ষেপ নেওয়া যেত। অথচ দেশটিতে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত।
ঘটনার পর ১৫ অক্টোবর জেদ্দায় বাংলাদেশের কন্স্যুলেট বিস্তারিত জানতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে কূটনৈতিক পত্র পাঠায়। পরবর্তীতে ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এছাড়া গত সোমবার জেদ্দায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের কূটনীতিকরা প্রশ্ন তুলেছেন—বিচারপ্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হলে এবং তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও কেন মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি মিশনকে জানানো হলো না? তবে সৌদি পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে শিগগিরই বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছে সূত্রটি। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই স্মারকলিপিতে বলা হয়, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের দূতাবাস কিংবা কন্স্যুলেটকে কিছু জানায়নি।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে সাবেক দুই মেয়রসহ আটক আওয়ামী লীগের তিন নেতা
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের আগস্টের শুরুতে নজরুল ও সুইটি আটক হন। নজরুলের পরিবার তার গ্রেপ্তারের খবর জানলেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি তারা সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে পারেন। এদিকে জেদ্দায় বাংলাদেশ কন্স্যুলেটের একটি গোপন স্মারকলিপি বলছে, আইনি সহায়তা চেয়ে নজরুল বা সুইটির পরিবারের পক্ষ থেকে মিশনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, একজন নাগরিক বিদেশে কারাগারে থাকাকালীন মিশন কীভাবে তাদের বিষয়ে উদাসীন থাকতে পারে? বিদেশ বিভুঁইয়ে কোনো বাংলাদেশি গুরুতর অভিযোগে আটক হলে তার মামলার হালনাগাদ তথ্য রাখা, আপিলের সুযোগ দেখা এবং আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করা কন্স্যুলার দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা এক্ষেত্রে সঠিকভাবে পালিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। তার সঙ্গে সপ্তাহে একবার পরিবারের সদস্যদের কথা হতো। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা থাকলে আইনি সহায়তা, দোভাষীর ব্যবস্থা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের মতো বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া জরুরি। ফলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের আগে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। বিদেশে দণ্ডিত নাগরিকদের প্রত্যাবাসন ও আইনি সহযোগিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল একটি সূত্র দাবি করেছে, দেশটিতে দণ্ড কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের মিশনকে লিখিতভাবে জানানোর অলিখিত রীতি রয়েছে। অথচ নজরুল ও সুইটির ক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। অন্যদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ১৩ জন বিচারকের একটি প্যানেল তাদের সাজা বহাল রাখেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিচারপ্রক্রিয়ায় দোভাষী থাকলেও অভিযুক্তরা নিজেদের পছন্দমতো দোভাষী বেছে নিতে পারতেন না, যা ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। নিম্ন আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পর আপিল আদালতের ১৩ বিচারকের একটি প্যানেল তাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
এই ঘটনা বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে বন্দি হস্তান্তর চুক্তির প্রয়োজনীয়তাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। গত ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা বিন ইউসুফ আল-দুহাইলানের সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দেশের বিচার বিভাগের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। তখন একটি চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছিল, কিন্তু ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এমন কোনো কার্যকর চুক্তি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ভারতের সঙ্গে ২০১০ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের এমন চুক্তি থাকলেও সৌদির সঙ্গে সেটি এখনো ঝুলে আছে। নজরুল ও সুইটির মামলার বিস্তারিত জানতে ঢাকা থেকে নতুন করে কূটনৈতিক পত্র পাঠানো হয়েছে, যার মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়ার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


















