সৌদিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত বগুড়ার শাহেদের পরিবারে শোকের ছায়া

সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের শাহেদ আহমেদ প্রাণ হারিয়েছেন। গত ১০ই অক্টোবর সৌদি স্থানীয় সময় বিকাল ৫টার দিকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। টার্মিনাল-৩ এলাকায় অবস্থানকালে শেষবারের মতো স্ত্রী কোহিনুর আক্তার কাকলীর সঙ্গে ফোনে কথা হয় তার। সে সময় স্ত্রীকে শাহেদ জানিয়েছিলেন, ঘণ্টাখানেক পরই তিনি বাসায় পৌঁছে কল করবেন। কিন্তু সেই কল আর আসেনি; অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই টার্মিনালে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে শাহেদসহ বেশ কয়েকজন ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। এ সময় সাংবাদিকদের কাছে নিজের বেদনার কথা তুলে ধরেন তিনি। এক-দেড় ঘণ্টা পর বাসায় গিয়ে তোমাকে ফোন দেবো। গাড়ি চালানোর লাইসেন্স জমা দিয়ে সেই চাকরিতে যোগ দেন।
আরও পড়ুন: শ্রীনগরে এক্সপ্রেসওয়েতে বাস খাদে, নিহত ৩
শাহেদের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে তার স্ত্রী কোহিনুর আক্তার কাকলী শোকে মুহ্যমান। তিনি বলেন, সৌদি আরবে যুদ্ধের পরিস্থিতির কথা ভেবে আমি তাকে যেতে দিতে চাইনি, কিন্তু সে জোর করেই কর্মস্থলে ফিরে গিয়েছিল। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে আমি কীভাবে বাঁচবো, কার ভরসায় সামনে এগোবো, তা ভেবে পাচ্ছি না। কোহিনুর জানান, তাদের সংসারে ১০ বছর বয়সী কাওসার এবং ছয় বছর বয়সী জিসান নামে দুই সন্তান রয়েছে। তিনি তার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সরকারের বিশেষ সহায়তা প্রত্যাশা করছেন। সৌদিতে নিহত শাহেদের স্ত্রীর আহাজারি। নিহত শাহেদের স্ত্রী কোহিনুর বলেন, সে যাওয়ার আগে থেকেই কেমন যেন লাগছিল, আগে কখনো এমন ভয় লাগেনি। এই সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে কিংবা বাইরে ঘুরতে যেতেন না। ১৩ বছর বয়সে শাহেদের সঙ্গে বিয়ে হয় জানিয়ে কোহিনুর বলেন, দু’জনের পছন্দের সম্পর্ক থেকেই ১৩ বছর বয়সে শাহেদের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। জিহাদের বয়স মাত্র পাঁচ বছর, আর কাউসারের ১০ বছর। ঢাকা থেকে মরদেহের সঙ্গেই গ্রামে আসেন নিহত শাহেদের স্ত্রী ও তাদের দুই অবুঝ সন্তান- ১০ বছর বয়সী কাওসার এবং ৬ বছর বয়সী জিসান। আমি চাই, আমার সন্তানদের নিয়ে যেন সারাটা জীবন বেঁচে থাকতে পারি।
আরও পড়ুন: ইতালির সিসিলিতে জোড়া ভূকম্পন, জারি হলো সুনামি সতর্কতা
গতকাল সকালে শাহেদের মরদেহ দেশে পৌঁছালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তা গ্রহণ করেন স্ত্রী কোহিনুর আক্তার। সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এ সময় মরদেহ হস্তান্তর করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। এরপর শুক্রবার দুপুরে বিশেষ গাড়িতে করে মরদেহ শাহেদের গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। ভবিষ্যতেও পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন প্রতিমন্ত্রী। সে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, কেঁদো না।
শাহেদ সৌদি আরবের জেদ্দায় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে প্লাম্বার হিসেবে কাজ করতেন। ভাইয়ের মৃত্যুর পর গত ৭ই সেপ্টেম্বর তিনি ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। এক মাস পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে কর্মস্থলে ফেরার পথে এই মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হন তিনি। তার স্বজনদের মতে, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে শাহেদ দিনরাত পরিশ্রম করছিলেন, কিন্তু সব স্বপ্ন এখন ধুলোয় মিশে গেছে। এর আগে তিনি গাড়িচালকের চাকরি করলেও পরবর্তীতে কাজের প্রয়োজনে জেদ্দায় পাড়ি জমান। পরিবারের সঙ্গে কাটানো সেই দিনগুলোই এখন কোহিনুরের স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসছে। তবে কাজের ব্যবস্থা করতে না পারায় দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল। পরে শ্বশুরের মাধ্যমে একটি কোম্পানিতে গাড়িচালকের চাকরি পান। পরে কর্মস্থল বদল হওয়ায় জেদ্দায় চলে যান।
এদিকে সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সৌদি আরবের দাম্মাম বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে হামলায় হতাহতের ঘটনায় বাংলাদেশ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বাংলাদেশ অবিলম্বে সব ধরনের হামলা বন্ধ এবং আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে। শাহেদের মৃত্যুতে পুরো মাদলা গ্রাম ও শাজাহানপুর উপজেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। উপার্জনক্ষম একমাত্র সদস্যকে হারিয়ে পরিবারটি এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে।















