নদীপথে বাড়ছে অপরাধ, চ্যালেঞ্জে নৌ পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা

দেশের বিস্তৃত নৌপথ এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে। নদীপথে মাছ ধরতে গিয়ে জলদস্যুদের হাতে প্রাণ হারাচ্ছেন জেলেরা, আর চাঁদাবাজি দিতে অস্বীকৃতি জানালে নৌশ্রমিকদের ওপর চালানো হচ্ছে নির্মম নির্যাতন। পণ্যবাহী নৌযান থেকে লুটপাটের পাশাপাশি অপহরণ, ছিনতাই, মাদক পাচার ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। নৌ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, সন্ধ্যা নামলেই নদীপথে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এ ঘটনায় ওই এলাকার জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে নৌ পুলিশ। এই চাঁদাবাজি বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান তিনি। ঘটনাস্থল থেকে রানা ও সাজ্জাদ নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নদীপথকে ১১টি প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ চালানো হচ্ছে। এতে হত্যা, অপমৃত্যু, ডাকাতি, ছিনতাই, অবৈধ বালু উত্তোলনসহ নানা অপরাধসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০২৪ সালে এ ধরনের ২ হাজার ৮৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৩ হাজার ৩৯৯টিতে দাঁড়ায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৩১৪টি। এর বাইরে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ৫০৫টি মামলা হয়েছে। সব মিলিয়ে গত প্রায় তিন বছরে মোট ৫ হাজার ৯৮৯টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আগের দুই বছরের উল্লিখিত সব শ্রেণির মামলা এবং চলতি বছরের ৯ মাসের এই ৫ শ্রেণির মামলা মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৮৯। গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে ভোলা সদর উপজেলার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের কাছে মেঘনা নদীতে মাছ ধরার সময় জলদস্যুদের গুলিতে মো. হোসেন (৩০) নামের এক জেলে নিহত হন। গুলিতে আহত হন আব্বাস (৩২), কাঞ্চন (৩৪) ও সোহেল (২৯) নামের আরও তিন জেলে। এতে জেলে, নৌযানের চালক ও যাত্রীরা সন্ধ্যার পর আতঙ্কে থাকেন। স্রোতে ভাসে অপরাধের চিহ্ন, পচন ধরে মরদেহে। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। তিনি বলেন, নদীতে চাঁদাবাজির অভিযোগ করলেও কেউ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করেন না। চলতি বছরের ২১ এপ্রিল দিবাগত রাতে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিপুর এলাকাঘেঁষা পদ্মা নদীতে এমন অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন পাবনার ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পাঁচ সদস্য।
নদীপথে সংঘটিত সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের পরিচয় ও ঘটনার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো
আরও পড়ুন: আদালতের নির্দেশে নিউইয়র্ক বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন স্থগিত
- গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে ভোলার মেঘনা নদীতে মাছ ধরার সময় মো. হোসেন নামের এক জেলে নিহত হন।
- একই ঘটনায় গুলিতে আহত হন আব্বাস, কাঞ্চন ও সোহেল নামের তিন জেলে।
- তাঁদের সবার বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার বাঘার হাওলা গ্রামে।
একদল জলদস্যু ট্রলারে ডাকাতির চেষ্টা করলে জেলেরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন, যার ফলে তাঁরা গুলির মুখে পড়েন। এছাড়া পণ্যবাহী নৌযানেও দস্যুতা চলছে। গত বছরের ১০ অক্টোবর নরসিংদীর মেঘনায় একটি বাল্কহেড থেকে ৩১৭ মেট্রিক টন সার লুট করে দুর্বৃত্তরা। এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর চাঁদপুরের হাইমচরে এমভি আল-বাখেরা জাহাজের সাত কর্মচারীকে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মল্লিকের মতে, দুর্গম চরাঞ্চলে রাতে ডাকাতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। সাধারণত সন্ধ্যার পর চাঁদপুরের হাইমচর, শরীয়তপুরের লক্ষ্মীচর ও কাঁচিকাটা, মুন্সিগঞ্জের পদ্মা-মেঘনার মোহনা ও সংলগ্ন চরাঞ্চল, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসংলগ্ন মেঘনা এবং বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জসংলগ্ন মেঘনার চরাঞ্চলে এসব হামলা হয়। শাহ আলম মল্লিক বলেন, এখন পদ্মা-মেঘনায় মা ইলিশ রক্ষায় কোস্টগার্ড, পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের দিনরাত অভিযান চলায় তেমন ডাকাতির ঘটনা ঘটছে না। তাঁর মতে, জেলার সীমানাসংলগ্ন নদীপথ ও প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে টহল বাড়ালে এসব অপরাধ কমবে। গত বছরের ১০ অক্টোবর নরসিংদীসংলগ্ন মেঘনা নদীতে একটি বাল্কহেড থেকে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বস্তা বা ৩১৭ মেট্রিক টন সার ডাকাতি করে দুর্বৃত্তরা। চাঁদা না দিলে হামলা, আক্রান্ত পুলিশও। বাংলাদেশ বাল্কহেড মালিক সমিতির সহসভাপতি আহমাদুল কবির মোল্লা বলেন, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর সংলগ্ন নদীতে পণ্য বোঝাইয়ের সময় প্রতিটি নৌযান থেকে ২ হাজার টাকা, ভোলার ইলিশায় ৫০০ টাকা এবং সাভারের রুস্তমপুর ও আমিনবাজারে আড়াই হাজার টাকা করে টোলের নামে চাঁদা নেওয়া হয়। গত বছরের ৭ অক্টোবর সকালে নারায়ণগঞ্জে মেঘনা নদীতে টেঁটা, বল্লম, রামদাসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে নৌযান থামিয়ে চাঁদা দাবি করে একটি সংঘবদ্ধ দল।
চাঁদাবাজির শিকার নৌশ্রমিকরাও।
বাল্কহেড মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ, ভোলা, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় পণ্যবাহী নৌযান থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হয়।
আরও পড়ুন: স্প্যানিশ ‘নোবেল’ পেলেন লিওনেল মেসি
চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় গত বছরের ৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের মেঘনায় শ্রমিকদের পিটিয়ে জখম করা হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ অভিযানে গেলে তাদের ওপরও টেঁটা ও বল্লম নিয়ে হামলা চালায় চাঁদাবাজরা।
এতে নৌ পুলিশের তিন সদস্য আহত হন।
এছাড়া কুষ্টিয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন পুলিশ সদস্যরা এবং পিরোজপুরে টহল শেষে ফেরার পথে ছুরিকাঘাতের শিকার হয়েছেন পুলিশ কনস্টেবল জাকির হোসেনসহ পাঁচজন। এতে সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মাকসুদ এবং কনস্টেবল সোহাগ ও সাইদুর জখম হন।
নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, চাঁদাবাজির ভুক্তভোগীরা মামলার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ দেখান, যা অপরাধ দমনে বড় বাধা। বর্তমানে সারা দেশে নৌ পুলিশের ১২৪টি ফাঁড়ি অপরাধ দমনে কাজ করছে। নদীপথে মাদকসহ অন্যান্য অপরাধীদের শনাক্তে জেলা ও মহানগর পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। নৌ পুলিশের অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত দুই বছরে চাঁদপুর ও বরিশাল অঞ্চলে অপরাধমূলক মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া ঢাকা, ফরিদপুর, রাজশাহী ও টাঙ্গাইলেও অপরাধের হার ঊর্ধ্বমুখী।
অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুকের মতে, নথিবদ্ধ পরিসংখ্যানের বাইরেও অনেক অপরাধের ঘটনা ঘটে যা রিপোর্ট হয় না। তাঁর মতে, কেবল টহল দিয়েই নদীপথের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; অপরাধীদের নজরদারি ও তত্ত্বাবধান আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশাল জলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নৌ পুলিশের জন্য নিয়মিত একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মতে, স্থলপথের তুলনায় দীর্ঘ নৌপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কম থাকায় অপরাধীরা এই পথ বেছে নিচ্ছে। মৎস্যজীবীদের জানমালের নিরাপত্তায় তখনো কোস্টগার্ড ও পুলিশের টহল জোরদার রাখা দরকার।



















